স্বাস্থ্য খাতে বরিশাল বিভাগের বঞ্চনা

 ‘ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল’। এই প্রবাদ বাক্য হইতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই জেলাটি একসময় সমৃদ্ধ ছিল। ইহার প্রাচীন নাম বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ যাহা সৃষ্টি হয় আজ হইতে ৪ হাজার বত্সর পূর্বে। বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষিয়া গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পলি জমিয়া যে কয়েকটি দ্বীপ সৃষ্টি হয়, তাহারই সমাহার বরিশাল। ফলে এই অঞ্চল ছিল গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যকেন্দ্র। ইহা দেশের খাদ্যশস্য ও মত্স্য উত্পাদনের অন্যতম মূল উত্স ও ভান্ডারও বটে। এইজন্য বরিশালকে বলা হইয়া থাকে বাংলার বা প্রাচ্যের ভেনিস; কিন্তু এই জনপদ বর্তমানে চরম অবহেলিত। অ্যালোকেশন বা বরাদ্দ অপ্রতুলতার কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা ক্ষেত্রে পিছাইয়া রহিয়াছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরিশাল। ভাবিতেও অবাক লাগে—এই করোনা দুর্যোগকালে সারা বরিশাল বিভাগ জুড়িয়া আইসিইউ বেড রহিয়াছে মাত্র ১৮টি। এই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জনবল নাই বলিলেই চলে। বরং অন্য বিভাগের চিকিত্সক দিয়া চালু রাখা হইয়াছে এই সেবা। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, করোনা সংক্রমণের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে রোগীকে বাঁচাইতে সকলের পূর্বে যে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা দরকার, তাহার একটিও নাই বরিশালে। ইহার জন্য এখন বরিশালের চিকিত্সকরা বিত্তবানদের নিকট হাত পাতিতেছেন। ইহার চাইতে দুঃখজনক খবর আর কী হইতে পারে!

এইখানেই শেষ নহে। স্বাস্থ্য খাতে বরিশালের বঞ্চনা আসলে ব্যাপক ও অন্তহীন। ছয় জেলা ও ৪২ উপজেলা লইয়া প্রায় ৮৬ লক্ষ মানুষ বসবাস করিতেছে বরিশাল বিভাগে। অথচ এইখানে অধ্যাপক মর্যাদার একজন চিকিত্সকও নাই। এই লক্ষ লক্ষ মানুষ তাহা হইলে সুচিকিত্সা পাইবেন কীভাবে? এইখানকার প্রধান হাসপাতালটির নাম শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। অথচ এইখানে ২২৪ চিকিত্সকের মধ্যে ৯৫ চিকিত্সকের পদই শূন্য। এই বিভাগে যেই সকল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল রহিয়াছে, সেইগুলির চিকিত্সকের ১ হাজার ১৩১টি পদের মধ্যে শূন্য ৪৭১টি। ইহার পাশাপাশি শূন্য রহিয়াছে নার্স, টেকনোলজিস্ট আর স্বাস্থ্যকর্মীর বহু পদ। আমরা এই দুঃখ কোথায় রাখিব—পুরা বরিশাল বিভাগে একজন আইসিইউ স্পেশালিস্ট নাই। বেসরকারি কোনো হাসপাতালে নাই আইসিইউ ব্যবস্থা। কিছুদিন পূর্বে ডা. আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু দেখাইয়া দিয়াছে, করোনা মোকাবিলায় এই বিভাগ কতটা অপ্রস্তুত। তাহাকে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সাপোর্ট দেওয়া যায় নাই। ডাক্তার-নার্সরা একজন ডাক্তারের চিকিত্সায় কতটা অসহায় ছিলেন তাহা এই ঘটনায় বুঝিতে পারা যায়। শেষ পর্যন্ত তাহাকে হেলিকপ্টারে করিয়া ঢাকায় আনা হয় এবং এক প্রকার বিনা চিকিত্সায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সাধারণ ক্যানুলায় ৪০ শতাংশ অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া যায়। তবে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলায় পাওয়া যায় ১০০ শতাংশ অক্সিজেন সাপ্লাই। আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন নেওয়ার পূর্বে এই ক্যানুলার মাধ্যমে সিংহভাগ রোগীই বাঁচিয়া যাইতে পারেন; কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখানে থাকিবে না কেন?

বরিশাল বিভাগের এই দুর্দশার জন্য প্রধানত জনপ্রতিনিধিরাই দায়ী। শেরে বাংলা এ কে এম ফজলুল হকসহ এখানকার অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চিরস্মরণীয় হইয়াছেন। বর্তমানেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রহিয়াছেন এই অঞ্চলে; কিন্তু হাতেগোনা কয়েক জন ছাড়া এখানকার নাগরিকদের অধিকার আদায় ও উন্নয়নে তেমন মনোযোগী নন বলিয়াই প্রতিভাত হয়। কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও বরিশাল বিভাগের বঞ্চনা ও বৈষম্য নিরসনে বিশেষভাবে উদ্যোগী হইতে হইবে। বর্তমানে করোনা মোকাবিলায় এই অঞ্চলের মানুষ যাহাতে হাতের নিকট সঠিক ও সুচিকিত্সা পাইতে পারেন এইজন্য কার্যকর ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।