জীবনের ‘তরঙ্গ মিলায়ে যায়’। মিলাইয়া যাইতেই হয়। ইহাই জাগতিক নিয়ম; কিন্তু তাহার পরও কিছু কিছু মানুষের চলিয়া যাওয়াটা কিছুতেই মানিয়া লইতে মন সায় দেয় না। মোহাম্মদ নাসিম তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। নাসিম শব্দের অর্থ ‘মৃদু-স্নিগ্ধ শীতল বায়ু’। রবীন্দ্রনাথের সহিত সুর মিলাইয়া বলা যায়—‘বায়ু বহে পূর্বসমুদ্র হতে/ উচ্ছল ছলো ছলো তটিনীতরঙ্গে।’ ‘নাসিম’ নামের সেই তরঙ্গায়িত উচ্ছল বায়ু চিরতরে মিলাইয়া গেল!
মানুষ চলিয়া গেলে তাহার উত্তম দিকগুলি প্রকাশ করাটাই সমাজের নিয়ম। যদিও প্রতিটি মানুষই দোষে-গুণে তৈরি। তবে মোহাম্মদ নাসিমের ৭২ বত্সরের জীবনের সার্বিক মূল্যায়নের তুলাদণ্ডে দেখা যাইবে তাহার গুণের পাল্লা বেশি ভারী। যাহারা জীবনে কখনো না কখনো নাসিমের নিকটবর্তী হইয়াছেন, তাহারা জানেন নাসিমের মতো বিনয়ী, মানবিক, অকুতোভয় ও দরদি নেতা এই দেশে খুব বেশি জন্ম লয় নাই। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম ও বাড়িয়া উঠা মোহাম্মদ নাসিম শৈশব হইতেই পার করিয়াছেন নানা চড়াই-উতরাই। রাজনীতির সহিত তিনি সম্পৃক্ত হন ষাটের দশকে। শুরুর দিকে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সহিত সম্পৃক্ত হইলেও পরবর্তীকালে যুক্ত হইয়াছেন ছাত্রলীগে। তাহার পিতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশে সরকারের মন্ত্রী, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী। পঁচাত্তরের নৃশংসতার ধারাবাহিকতায় তিনিও তাহার পিতাকে হারান। তাহাকে কারারুদ্ধ করা হয়। সিরাজগঞ্জ-১ আসনে তিনি ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ঐ শুরু। ইহার পর ঐ একই আসন হইতে নির্বাচনে অংশ লইয়া তিনি প্রতিবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ইহার মধ্যে কেবল ২০০৮ সালে মামলার কারণে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারেন নাই। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পণ, মোবাইল ফোনের একচেটিয়া ব্যবসাকে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক করিয়া দেওয়ার জন্যও তাহার সদর্থক ভূমিকা চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। আন্দোলনেও তাহার মতো নির্ভীক, দুঃসাহসী নেতা খুব বেশি নাই। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রাজপথে আন্দোলনে তিনি ছিলেন শার্দূল-ন্যায় সাহসী। বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি আহত হইয়াছেন, রক্তাক্ত হইয়াছেন; কিন্তু রাজপথ ছাড়েন নাই। তিনি আওয়ামী লীগের হুইপ হইতে শুরু করিয়া স্বরাষ্ট্র, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং সর্বশেষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। তিনি ছিলেন ১৪ দলের মুখপাত্র। রাজনৈতিক সক্রিয়তার পাশাপাশি আমরা তাহাকে দেখিতে পাইয়াছি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করিয়াছেন।
মোহাম্মদ নাসিমের এইভাবে চলিয়া যাওয়াটা আমরা মানিয়া লইতে পারিতেছি না। তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তবে দেশপ্রেম, বিনয়, নির্ভীকতা ও মানবতার যে তরঙ্গ মোহাম্মদ নাসিম আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়াইয়া গিয়াছেন, তাহা মিলাইবে না সহজে। আমরা তাহার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করিতেছি।