করোনার কারণে মানুষের জীবন ও জীবিকা এক জটিল সমীকরণে পড়িয়াছে। এই সমীকরণ মিলানোই এখন বিশ্বের কাছে সবচাইতে বড়ো চ্যালেঞ্জ। আশঙ্কা করা হইতেছে, করোনাকালে কাজ হারাইবেন বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ। করোনার প্রকোপ চলিতে পারে আরো দুই বত্সরাধিক কাল। এই সময়ে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রেই রাজস্ব হ্রাস পাইবে নিদারুণভাবে। এই সময়ে অসংগঠিত খাতে কর্মজীবীদের অবস্থা সবচাইতে খারাপ হইবে। তবে করোনার কারণ ছাড়াও প্রক্রিয়াসংক্রান্ত জটিলতায় অনেকের বেতন-ভাতা আটকাইয়া থাকিবার ঘটনাও রহিয়াছে। করোনার এই ভয়ংকর সময়ে দীর্ঘ ছয় মাস বেতন-ভাতা আটকাইয়া থাকা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। এমন ঘটনা ঘটিয়াছে দেশের ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ৭৭৭ জন শিক্ষকের ক্ষেত্রে। তাহারা টানা ছয় মাস কোনো বেতন-ভাতা পাইতেছেন না। স্বাভাবিকভাবেই এই দুর্যোগকালে তাহারা পরিবার-পরিজন লইয়া চরম মানবেতর জীবন যাপন করিতেছেন। এই শিক্ষকেরা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের স্কিলস অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রকল্পের (স্টেপ) শিক্ষক।
মূলত প্রকল্পটি গত বত্সরের জুনে শেষ হইয়া যাইবার পর সরকার এই শিক্ষকদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত লইয়াছিল। কিন্তু রাজস্ব খাতে স্থানান্তরে বিলম্ব হইবার কারণে গত বত্সরের জুলাই হইতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাস এই শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হইলেও গত জানুয়ারি হইতে তাহারা আর কোনো বেতন-ভাতা পান নাই। এই মুহূর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকিলেও এই শিক্ষকেরা কিন্তু অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম যথারীতি চালাইয়া যাইতেছেন। স্পষ্টতই সরকারের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে এই শিক্ষকেরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতেছেন। অথচ তাহারা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাইতেছেন না! একটি সহযোগী দৈনিকে এই সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদে বলা হইয়াছে, দেশের ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে মোট শিক্ষক রহিয়াছেন ১৪২৭ জন। তাহার মধ্যে রাজস্ব খাতে ৬৫০ জন আর প্রকল্পের এই ৭৭৭ জন। এই স্টেপ প্রকল্প চালু হয় ২০১২ সালে। তখন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলিতে যোগ্য শিক্ষক দেওয়ার জন্য এই প্রকল্পের অধীনে ১ হাজার ১৫ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। ২০১২ ও ২০১৪ সালে দুই দফায় নিয়োগ দেওয়া মোট ১০১৫ জনের মধ্যে এখনো ৭৭৭ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। বাকিরা চাকরি ছাড়িয়া অনেক আগেই চলিয়া গিয়াছেন। কিন্তু করোনার এই দুর্যোগকালে এই শিক্ষকদের এইভাবে কাজ করিয়া যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথও নাই।
মানুষের জীবন যেমন অমূল্য, তেমনি তাহার বাঁচিয়া থাকিবার জন্য ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। ইহা মানিতে হইবে যে প্রকল্পের এই শিক্ষকেরা ক্লাস নেওয়া বন্ধ করিলে সারাদেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলির শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হইবে চরমভাবে। ইহাতে অর্ধেকের অধিক শিক্ষক কমিয়া যাইবার পাশাপাশি অনেক বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক কোনো শিক্ষকই আর থাকিবেন না। জানা গিয়াছে, এই শিক্ষকদের রাজস্ব খাতে আনিবার কাজটি এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রহিয়াছে। আমরা আশা করিব, করোনার এই মহাদুর্যোগের সময় ইহার সুরাহা করিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অকারণ কালক্ষেপণ করিবে না।