আমেরিকার নাভিশ্বাসে দুনিয়ার শ্বাসকষ্ট

আমেরিকা আজ বিপন্ন এক দেশ। মানুষের এক সময়ের স্বপ্ন আর  নির্ভরতার দেশ এখন বিপদের মুখে। একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ ৪৬ বছর বয়স্ক জর্জ ফ্লয়েডকে গ্রেফতারের সময় তার গলায় হাঁটু দিয়ে জোরে চেপে বসে আছেন আর মি. ফ্লয়েডকে হাঁসফাঁস করে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না,’ এমন একটি ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। যা এখনও পর্যন্ত গড়িয়েছে।

একদা মসি ছিল অসির চেয়ে ঢের বেশি শক্তিশালী। আর এই উত্তরাধুনিক দুনিয়ায়, এই ‘ডিজিটাল ডাইন্যাসটি’-র আমলে, কলমের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী হলো ক্যামেরা। গোটা পৃথিবী সবিস্ময়ে তার প্রামাণ্য ভিডিও দেখল, অতি সম্প্রতি, মিনেসোটা প্রদেশের মিনিয়াপোলিস শহরে। স্রেফ একটা ছবি রীতিমতো একটা সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিল মার্কিন মুলুকে এবং ইতিহাস বলছে, গত শতকের ছয়ের দশকের মাঝপর্বে বর্ণবৈষম্য ও সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই গণ-আন্দোলনের পর, এমনটা আর কখনো দেখেনি আমেরিকা। এটা যে ঘটল তার কারণ, মার্টিন লুথার যে সুষম সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি সুসভ্য এবং সমৃদ্ধ আমেরিকায়। বরং বাস্তবটা হলো এই যে, ওই ভিডিয়ো ক্লিপিংসটা একটা ‘শো-কেস’ মাত্র, যেটা বিবৃত করে, এ রকম আরো আছে। যুগযুগান্ত ধরে ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে’! সেই কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের ‘গায়ের জোর’! সেই সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগুরুদের ‘বলপ্রয়োগ’! সে দিনের মিনিয়াপোলিসের ওই ছবিটা আরো একবার জানান দিল, ‘গভীরে যাও, আরো গভীরে যাও’।   

ভাবলে বিস্ময় লাগে যে, এদেশে ছিলেন মার্টিন লুথার কিং। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। এদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন আব্রাহাম লিংকন বা জর্জ ওয়াশিংটন। আজ এক বদ্ধ লোকের হাতে পড়ে আমেরিকা নিজেই দাঁড়িয়েছে আমেরিকার মুখোমুখি। জর্জ ফ্লয়েড যদি মারা না যেতেন আমরা জানতে পারতাম না বুঝতে পারতাম না প্রদীপের তলায় কতটা অন্ধকার। করোনা মহামারি আমেরিকার পোশাক খুলে দিলেও এই ঘটনা তার প্রায় অন্তর্বাসও কেড়ে নিয়েছে। কোনো সভ্য দেশে সভ্য সমাজে এমন লুটপাট দেখা যায় না। ইরাক সিরিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলোর চাইতেও ভয়াবহ এই লুটপাট প্রমাণ করে দিয়েছে আমেরিকায় শ্রেণিবৈষম্য কত প্রকট।

মানুষের এই চলতি আন্দোলন এক সময় থিতিয়ে যাবেই। বরং এই ঘটনার পর থেকে  মার্কিন দেশে মানুষে মানুষে সন্দেহ বাড়বে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত আর শপিংমলে সাদারা ভুরু কুঁচকে তাকাবে কালোদের দিকে, স্বভাবের দোষে, ‘জলের গতি যেমন সদা নিম্ন দিকে ধায়’। পাড়া পার্ক আর গির্জায় কালোরা রুষ্ট চোখে তাকাবে সাদাদের দিকে, আক্রোশের অভ্যাসে, ‘আগুনেরই স্বভাব যেমন সবকিছু পোড়ায়’! সংখ্যাগুরুরা সুযোগ পেলেই সংখ্যালঘুদের ঘাড় মটকে দেবে। জাতীয় পতাকা হাতে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় এক মার্কিন নাগরিক পাশের সহনাগরিকের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে তার গায়ের রংটা দেখে নেবে। বোঝার চেষ্টা করবে, তার কথাবার্তায় ‘অ্যাক্সেন্ট’ আছে কি না। এই বিশ্বাসহীনতার ফিতে কেটে দিয়েছেন আমেরিকার ‘একটু অন্যরকম’ রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং। তিনি প্রতিবেশী দেশের লাগোয়া সীমান্তে প্রাচীর তুলে দিতে চাইছেন। তিনি পেশাদার অভিবাসীদের আমেরিকা থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছেন। তিনি একটা বিশেষ দেশের পড়ুয়াদের আমেরিকায় ঢোকা বন্ধ করে দিতে চাইছেন। এ ভাবেই লিঙ্কন আর লুথারের নির্মিত সমতার মানচিত্র থেকে দিনান্তের আলোর মতোই হারিয়ে যাচ্ছে ‘বহুজাতিক’ আমেরিকা। কয়েকটা বছর আগে দেখা আমাদের সেই বহুত্ববাদের আমেরিকা দ্রুত, খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

এই ‘নতুন’ আমেরিকাকে আমরা চিনি না। আমাদের মনে হবে এই কি সেই আমেরিকা, যেখানে যাওয়ার জন্য বাঙালি ঢাকার রাজপথে রাত জেগে লাইনে দাঁড়াত? এই কি সেই দেশ, যেখানে পা রাখার জন্য এককালে তারকারা পাগলের মতো ছুটত? এই কি সেই আমেরিকা, যার নামে দুনিয়া একঘাটে পানি খেত?

সে আমেরিকা আর আজকের আমেরিকায় বিশাল ফারাক। এই ফারাক পূরণ করা সহজ হবে না। আমাদের অবশ্য খুব বেশি আনন্দিত হবার কারণ নাই। আমরাও নানাভাবে বিদ্বেষ আর হিংসায় পরিপূর্ণ এক সমাজের মানুষ। ধর্মের নামে সম্প্রদায়ের নামে রাজনীতির নামে লিঙ্গভেদে আমরাও বৈষম্যের শিকার। তার পরও সবাইকে ছাড়িয়ে ট্রাম্পের আমেরিকা আজ নেগেটিভ আমেরিকা। তার এই কলঙ্ক সহজে মুছবে বলে মনে করার কোনো কারণ নাই।

n লেখক :সিডনি প্রবাসী লেখক