চিরনিদ্রায় শায়িত মোহাম্মদ নাসিম

সবাইকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন প্রবীণ রাজনীতিক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম এমপি। সোবহানবাগ জামে মসজিদে এবং বনানী কবরস্থান মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পৃথক দুটি নামাজে জানাজা শেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা আর হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসার মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। সব মহলে অসম্ভব জনপ্রিয় মোহাম্মদ নাসিমকে একটু দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে দুটি জানাজায় ছিল জনতার ঢল। একজন রাজনীতিক কতটা জনপ্রিয় হতে পারেন, করোনা দুর্যোগের মধ্যে শেষযাত্রায় মানুষের ঢলই তার প্রমাণ। প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য মোহাম্মদ নাসিমের জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ থেকেও হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ঢাকায় এসে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

বনানীতে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। পরে জাতীয় ও দলীয় পতাকায় মোড়া মোহাম্মদ নাসিমের কফিনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে তার সামরিক    সচিব পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার সামরিক সচিব মোহাম্মদ নাসিমের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর সোবহানবাগ মসজিদে মোহাম্মদ নাসিমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কিছুক্ষণের জন্য মরদেহ তার ধানমন্ডির বাসভবনে নেওয়া হয়। বনানীতে জানাজা ও শ্রদ্ধা জানানো শেষে নাসিমের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাকে দাফন করা হয়। সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় জানাজা ও দাফন কাজে পুলিশের ব্যাপক তত্পরতা ছিল। বনানী কবরস্থানেই শায়িত আছেন মোহাম্মদ নাসিমের বাবা জাতীয় চার নেতার একজন এম মনসুর আলী।

বনানীতে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিমের দুই ছেলে তানভির শাকিল জয় এবং তন্ময় মনসুর। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল মতিন খসরু, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, গণআজাদী লীগের সভাপতি এস কে শিকদারসহ ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্র পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। জানাজায় শরিক হন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। মরহুমের পরিবারের পক্ষে নামাজে জানাজায় পিতার জন্য দোয়া কামনা করেন মোহাম্মদ নাসিমের বড়ো ছেলে তানভির শাকিল জয়।

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমিত পরিসরে মোহাম্মদ নাসিমের নামাজে জানাজার ব্যবস্থা করে আওয়ামী লীগ। বারবার সবার উদ্দেশে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। কিন্তু মানুষের ভিড় ছিল অনেক। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক সাংবাদিকদের বলেন, ‘মোহাম্মদ নাসিম ভাইকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ এবং দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হারিয়েছেন বিশ্বস্ত হাতিয়ার। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ছিল মোহাম্মদ নাসিম ভাইয়ের।’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আপসহীন নেতা ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচল।’ এদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গতকাল সকালে ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল থেকে সরাসরি বনানী কবরস্থানে যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তার সঙ্গে ছিলেন ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লোট’ কিট প্রকল্পের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. মুহিব উল্লাহ খোন্দকার এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দপ্তর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছিল ৭২ বছর বয়সি মোহাম্মদ নাসিমের। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শনিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে মারা যান তিনি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার একজন এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম সংসদে ষষ্ঠবারের মতো সিরাজগঞ্জ-১ আসনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। পরের বছর মার্চে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তাকে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মোহাম্মদ নাসিম এক সঙ্গে দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত। পরে মন্ত্রিসভায় রদবদলে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালে তাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেন শেখ হাসিনা। এবার মন্ত্রিত্ব না পেলেও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য থাকার পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি। রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় এম মনসুর আলী ও মা মোসাম্মত্ আমেনা মনসুরের ঘরে। শহিদ এম মনসুর আলী স্বাধীনতাপরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।