করোনায় চুল কাটা সমস্যা

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আমাদের অভ্যস্ত জীবনে নানা উটকো ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। রোগ সংক্রমণের আতঙ্ক, ঘরে বসে সময় কাটানোর বিড়ম্বনা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ-মনোমালিন্য বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে চুল-দাড়ির সমস্যা। আগে শৌখিন ও অলস মানুষেরা সেলুনে গিয়ে এই বাহুল্য জিনিসগুলো ছাঁটিয়ে আসতেন, এখন সেসব বন্ধ। তাই দিকে দিকে অস্বস্তি। লম্বা চুল-দাড়ি নিয়ে আর কত অপেক্ষা করা যায়?

‘লকডাউন’ চলছে তিন মাস হলো। কিছুতেই কাটছে না কর্মজীবী মানুষের কর্মহীন অলস সময়। এতে মানুষের মধ্যে অস্বস্তি আর পরিবারে অশান্তি কেবলই বাড়ছে। বিশ্রামে বিশ্রামে ক্লান্ত। তাই ঘুরেফিরে চোখ যায় ফেসবুকে। করোনাকালে ছবিতে ঠাসা ফেসবুকের দেওয়াল। ব্যক্তিগত প্রোফাইলেও দেখা যাচ্ছে নতুন চেহারা। সবাই এখন নিজের চুল-দাড়ি-গোঁফ নিয়ে নানা রকম ‘স্টাইল’ করছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা এমন সব ছবি দিচ্ছে যে প্রথম দর্শনে চিনতে কষ্ট হয়। লম্বা ঝাঁকড়া চুল। দামিয়ে ওঠা অবিন্যস্ত দাড়ি-গোঁফ। কেউ কেউ ছবির সঙ্গে ক্যাপশন দিচ্ছে—‘করোনাকালের সাধুবাবা’। কেউ আবার মাথা ন্যাড়া করে ছবি ছাড়ছে। তবে সম্প্রতি ‘টাকমাথাওয়ালাদের করোনা হওয়ার আশঙ্কা বেশি’—এমন এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর ন্যাড়া হওয়া এবং ন্যাড়া মাথার ছবি ফেসবুকে আপলোড করার হিড়িক কিছুটা কমেছে বলেই মনে হচ্ছে!

এই ঘরবন্দি জীবনে সবাই উপলব্ধি করছে, সমাজে নরসুন্দরদের প্রয়োজন কতটা জরুরি। চুল-দাড়ি কামিয়ে নরকুলকে বাহ্যিকভাবে সুন্দর বানায় বলেই এদের নাম হয়েছে নরসুন্দর। প্রচলিত ভাষায় বলা হয় নাপিত। আর প্রমিত বাংলায় বলে ক্ষৌরকার বা পরামাণিক। আধুনিক যুগে আমরা বলি সেলুনকর্মী। নাম যাই হোক, ক্ষৌরকর্ম নিঃসন্দেহে একধরনের আর্ট। বাহারি ফ্যাশনের হেয়ারকাট দেখলেই তা বোঝা যায়। এই পেশা চলমান আছে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের আদি লগ্ন থেকেই।

নরসুন্দর এমনই এক বিশ্বস্ত পেশাজীবী গোষ্ঠী, যার কাঁচি ও ক্ষুরের নিচে নিশ্চিন্তে কাস্টমাররা মাথা নোয়াতে পারে! উদ্ধত সেনাপতি, মহাপরাক্রমশালী মন্ত্রী, ছিঁচকে চোর, পকেটমার, বুদ্ধিজীবী—সবারই অনায়াসে কান ধরতে পারে একজন সেলুনকর্মী! আমাদের ‘ইগো’সর্বস্ব মানবসমাজে এ এক আশ্চর্য বাস্তবতা! আমাদের দেশে একসময় শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের একটি অংশ এ পেশায় জড়িত ছিল। এখন পেশাটি আর ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত নেই। এখন ধর্মনির্বিশেষে অনেকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিচ্ছে এই পেশা।

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আঙ্গিক বদলেছে নরসুন্দরের দোকানের। কয়েকটা দাঁতভাঙা চিরুনি, ভাঙা আয়না, ক্ষুর, এই ক্ষুর ধার দেওয়ার জন্য বেল্টের মতো এক টুকরো ঝোলানো চামড়া, দস্তার একটা এবড়ো-খেবড়ো বাটিতে সামান্য পানি ইত্যাদি উপকরণের পরিবর্তে এখন চুল-দাড়ি কাটার জন্য অনেক আধুনিক উপকরণ যুক্ত হয়েছে। খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য যুক্ত হয়েছে এলইডি টিভি, ওয়াইফাই। তার পরও বাপ-দাদার পেশার পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন অনেকে। গ্রামের হাটবাজার ও রাস্তার পাশে গাছতলায় এখনো চালাচ্ছে ক্ষৌরকর্ম। একটা সময় ছিল, নরসুন্দররা হাটবাজারে বসার পাশাপাশি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল-দাড়ি কামাত। সেই সময়টায় মানুষের হাত ও পায়ের নখ কাটার কাজটিও করত তারা। এ নিয়ে একটি প্রবাদ আছে—‘নাপিত দেখলে নখ বাড়ে’।

আমরা ছোটোবেলায় বাড়িতেই চুল কাটতাম। যতদূর মনে পড়ে, খিতিশদা নামে এক ব্যক্তি আমাদের বাড়িতে এসে সবার চুল কেটে দিত। বাঙালি রবীন্দ্র-নজরুলের পূজা করে বটে, কিন্তু তাদের লম্বা চুলের সঙ্গে যে কাব্যপ্রতিভার কোনো সংঘাত নেই, এটা কেন জানি বাপ-কাকারা বুঝেও বুঝতেন না। সবারই ধারণা, শ্রীমানের চুল অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা অবিলম্বে কর্তন না করলে উচ্ছন্নের রাস্তা অতি সুগম।

খিতিশদা চুল কাটার আগে বাপ-কাকারা নিষিদ্ধ ফিসফিসানির মতো কী একটা বলতেন। সেই ফিসফিসানির বেদমন্ত্র ছিল—চুলটা যত পারো ছোটো কোরো। আজ অব্দি কোনো মহামানবের আমি ছোটো চুল দেখিনি। তবু কেন যে বড়ো চুল নিয়ে সনাতন সমাজে এত বিরাগ, তা আমার বোধগম্য হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার ‘বিরানি’ খেতে আসতেন, তখন তারাও সবার আগে চড়াও হতেন বড়ো চুল আছে এমন ব্যক্তিদের ওপর। একবার আমাদের পাড়ার এক বড়ো চুলওয়ালা পাগলকে তারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সেই বেচারা রাজনীতির সাতে-পাঁচে কখনো ছিল না। তার একটাই অপরাধ ছিল, নিজেকে সে দেশের রাষ্ট্রপতি মনে করত। কিন্তু তার এই ‘মনে করা’ নিয়ে কারো মধ্যে কোনো ক্ষোভ ছিল না। এ নিয়ে কারো সঙ্গে তার সংঘাতও হতো না। নিজেদের বাধ্যতামূলক ছোটো চুলের কারণেই কি না, আর্মি-পুলিশ-র্যাবের সব সময়ই প্রধান টার্গেট হয় বড়ো চুলওয়ালা ব্যক্তিরা!

যা হোক, খিতিশদা বাক্স খুলে যন্ত্রপাতি বের করত। একটি সুপ্রাচীন মরচে ধরা কাঁচি আর খান কতক নানা মাপের চিরুনি। আমার কেন জানি মনে হতো, চাণক্যর টিকিও এই কাঁচিতেই কাটা হয়েছিল। আমি বসতাম একটি ছোটো পিঁড়িতে। খিতিশদা তার লিকলিকে দুই হাঁটুর ফাঁকে আমার মাথাটা ফরসেপের মতো চেপে ধরত। তারপর কাঁচি চালাত এক অপূর্ব তাল-লয়ে। আমার ঘাড় টনটন করত। মাথাটা মুক্তির আশায় ছটফট করত ঘনঘন। কিন্তু খিতিশদা কিছুতেই হাঁটু দুটো আলগা করত না। মিনিট পনেরোর নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচারের পর যখন খিতিশদা হাঁটু আলগা করত, তখন নিজেকে খাঁচাছাড়া অচিন পাখি মনে হতো। খিতিশদা ভাঙা আয়নাটা সামনে ধরত। এ কী! এ কি আমি? নিজেকেই যে চিনতে পারছি না!

শৈশবে আমরা বাড়িতেই চুল কাটাতাম। এরপর কৈশোরে সেলুনে গিয়ে চুল কাটাতে শুরু করি। তবে তখন পাড়ার সেলুনের নাপিতেরা ছিল ভয়ংকর মেজাজের। সিনেমার নায়কদের বড়ো চুল দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে যদি বলতাম, একটু বড়ো রাখো কাকু, খেঁকিয়ে উঠত। বলত দাঁড়া, তোর বাপ বাজারে আসুক, টেরি কাটা ঘুচোচ্ছি। এখন অবশ্য নাপিতেরা যত কম চুল কাটতে পারে আর যত বেশি টিপস পেতে পারে তত খুশি হয়। এটা সম্ভবত বিবর্তনের ফল।

নাপিতেরা বড়ো রসিক হয় চিরকাল। হাসিনা-খালেদা, মোদি, ট্রাম্প, ট্রুডো, পুতিন, প্যান্ডামিক, রেসিশান, অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, সিনেমা, খেলা, মদ্যপান—সব গল্প জানে। বিশ্বের সর্বশেষ পরিস্থিতি, ট্রাম্প আগামী নির্বাচনে জিততে পারবেন কি না, সিকদার পরিবারের সন্তানেরা দেশে ফিরে আসবেন কি না, সেটা সেলুনে গেলেই জানা যায়। করোনার ওষুধ যে ইতিমধ্যে চীন আবিষ্কার করে ফেলেছে এবং রোগটা আরো ছড়ানোর পর চাহিদা যখন খুব তীব্র হবে, তখন তারা ঠিকই ওষুধ বাজারে ছাড়বে—এই তথ্য নাপিতেরা ছাড়া কেউ জানে না। সোনার দাম, জমির দাম, ফ্ল্যাটের দাম, বাড়ির দাম, মানুষের দাম—নাপিতেরা সব জানে। এমনকি ব্লাড সুগার ও প্রেশার কমাতে কোন ওষুধ সবচেয়ে কার্যকর, গোঁফে ও চুলে রং লাগানোর আগে তারা সেটাও বলে দেয়। কিন্তু করোনাকালে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে দেশের এই সেলুনকর্মীরা।

লকডাউনের মধ্যেই একটু একটু করে দোকান-টোকান খুলছে। কিন্তু সেলুন খোলার লক্ষণ নেই। সেলুনের ওপর রাষ্ট্র নাখোশ। সেলুন কিছুতেই খোলা যাবে না। কারণ, চুল-দাড়ি কাটতে গেলে দুটো মানুষ কাছাকাছি হয়। নাপিতের নিঃশ্বাস শিল্পপতি-মন্ত্রীদের গায়ে লাগে। বুর্জোয়ার ঘাড় ধরে প্রলেতারিয়েতের এমন টানাটানি বোধহয় সেলুনেই সম্ভব। সেলুন বস্তুত সাম্যের পরাকাষ্ঠা। তুমি যেই হও বাপু, তোমার মুণ্ডু নিয়ে গেণ্ডুয়া খেলার হক শুধু নাপিতেরই আছে।

ঘরবন্দিকালে পেশাজীবী নাপিতদের রুজি বন্ধ হয়ে গেছে এবং এই বঙ্গে নাপিতের ভূমিকায় আপাতত মেয়েরা আবির্ভূত হয়েছে। মেয়েদের অসীম ক্ষমতার শেষতম সংযোজন পুরুষের চুল কাটা। সরঞ্জাম বলতে একটা কাঁচি আর একটা চিরুনি। নাপিতের বাক্স বলে যে একটা চরম ঐশ্বর্যময় ও রহস্যে মোড়া  জাদুবাক্স ছিল, সেটা আপাতত তালাবন্দি। বাড়ির বারান্দায় পুরুষটি, মেনি বিড়ালের মতো ঘাড়টা আভূমিপ্রণত হয়ে আছে। আর নারী ত্রিশূলের মতো এক হাতে কাঁচি আরেক হাতে চুলের গোছা ধরে ‘আমি ছিন্নমস্তা চণ্ডী আমি রণদা সর্বনাশী’ গোছের ভাব নিয়ে কেটে দিচ্ছে ‘বেহায়া পুরুষের’ কেশদাম। পুরুষের ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দেওয়ার এই সুযোগ মানব ইতিহাসে আদৌ আসবে কি না, কে জানে!

তবে পুরুষ মহারাজেরা চুল কাটানোর এই প্রক্রিয়ায় মোটেও সন্তুষ্ট নয়। কারণ এখানে চুলটাই শুধু কাটা হয়, কিন্তু সেই ‘স্বর্গসুখ’ নেই। সেলুনে সবচেয়ে ‘স্বর্গসুখ’ হচ্ছে চুল-দাড়ি কাটানোর পর ‘দলাই-মলাই’। ভ্রুর ওপর আঙুল চালনা, কপাল চেপে দেওয়া, ঘাড়-গর্দানে হাত বোলানো, মাথাটাকে দুই হাতের তালু দিয়ে ঠাস ঠাস বাড়ি মারাসহ নানা প্রক্রিয়ায় সেলুনকর্মীরা যে সুখানুভূতি উপহার দেন, এমন স্বর্গসুখ জীবনে খুব কমই পাওয়া যায়। যদি একবার আপনি সেলুনকর্মীকে উপযুক্ত বকশিশ দিয়ে খুশি করতে পারেন, তাহলে পরেরবার আরো দীর্ঘক্ষণ ধরে স্বর্গসুখ প্রদানের নিশ্চিত ব্যবস্থা। বকশিশের লিমিটটা অবশ্য দেশে খেলাপ হওয়া ঋণের পরিমাণের মতো বাড়িয়ে যেতে হবে।

তবে কবুল করা ভালো যে দেশের শোষিত-বঞ্চিত মধ্যবিত্তের জীবনে সেলুন এক অনন্ত বিলাস। আমার মতো একজন ‘নামগোত্রহীন’ মানুষকেও পাড়ার সেলুনে যে সম্মান দেয়, অন্য কোথাও তো নয়ই, পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যের কাছেও তা পাই না!

n লেখক :রম্যরচয়িতা