করোনা থেকে আম্ফান :ইতিহাসের পরম্পরায়

করোনার মধ্যে গত ২০ মে ২০২০ দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে বাংলাদেশের ২৬টি জেলা ক্ষতবিক্ষত করেছে। যার মধ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, নোয়াখালী, বাগেরহাট ও যশোর মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। মৃত্যুর সংখ্যা জানা গেছে ২২ জন। ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার ৬৬৭টি। ১ লাখ ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রায় ২০০টির মতো ব্রিজ বা কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। ১৫০ কিলোমিটারের মতো বাঁধ ভেঙে গেছে। মত্স্যসম্পদ নষ্ট হয়েছে প্রায় ৩২৫ কোটি টাকার। খুলনার কয়রা অঞ্চলের মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। করোনার সময়ে এ যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

ইতিহাস বলে ১৭৭০ সালে (১১৭৬) অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ফলে দেশ জুড়ে চরম অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ত্রুটিপূর্ণ ভূমির রাজস্বব্যবস্থা ও খাদ্যবাজারে দালাল-ফড়িয়া শ্রেণির দৌরাত্ম্যের কারণে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যা ’৭৬-এর মন্বন্তর নামে পরিচিত। এরপর দেশে যে পরিমাণ ভিক্ষুকের প্রাদুর্ভাব বাড়ে তা আগে কখনো দেখা যায়নি। ১৯২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার পর মানুষের মধ্যে অনেক বেশি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। যার দৃষ্টান্ত শরত্চন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসে ইন্দ্রনাথ চরিত্রে পাওয়া যায়। সে বলছে, ‘মড়ার আবার জাত কী?’ এই সংলাপটির মধ্য দিয়ে সে সময়ের সমাজবাস্তবতার এক চমত্কার চিত্র ভেসে উঠেছে।

১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগে আগে সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা হাতিয়া, রামগতি, চর আবদুল্লাহ, সন্দ্বীপ, তালচর, চর জব্বার, তজুমুদ্দিন, চর কচ্ছপিয়া, চর পাতিলা, কুকড়ি-মুকড়ি, মনপুরা, চরফ্যাশন, দৌলতখান, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, চট্টগ্রামসহ আরো বিভিন্ন জেলায় নেমে আসে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ‘গোর্কি’। শতাব্দীর ভয়াবহতম এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি, গ্রাম এবং শস্যখেত স্রোতে তলিয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ সহায়সম্বল হারালেও তত্কালীন পাকিস্তান সরকার এই দুর্যোগ মোকাবিলায় তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তত্কালীন রাজনীতিতে নতুন মোড় নেয়।

সত্তরের বন্যার পর সিডর, আইলা, মহাসেন—এরকম অজস্র ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায় প্রতিবছরই আঘাত হেনে নিঃস্ব করে দুর্গত এলাকার মানুষকে। বাঁধ ভাঙছে, ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, মানুষ, প্রাণী ও পাখির জীবনহানি ঘটছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী প্রাকপর্বে দাঁড়িয়েও আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এখনো সাইক্লোন সহনশীল বাড়ির মডেল উপহার দিতে পারেনি—যেখানে কৃষক ছোটো ছোটো ঘর করে ঝড়-বৃষ্টি-সাইক্লোন মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে এবং নিজের বাড়িতেই হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল নিয়েই অবস্থান করতে পারবে। সরকারের দৃষ্টি এখনো সেখানে নিবদ্ধ হয়নি, বাজেটের গতিপথ সেদিকে মোড় নেয়নি।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মানুষের দারিদ্র্য যেভাবে গভীর হচ্ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দা দেখা দেবে। ইতিমধ্যে আমাদের রপ্তানি খাত ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স খাত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। একটা ব্যাপকসংখ্যক প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছে। পোশাকশিল্প খাতসহ ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতসমূহের টালমাটাল অবস্থা। তাহলে অর্থনৈতিক এই মন্দা কাটিয়ে স্বাভাবিক গতিধারায় ফেরার উপায় কী?

আপাতদৃষ্টে বরাবরের মতোই কৃষি বা গ্রামীণ অর্থনীতিই মূল ভরসা; কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আমাদের কৃষি খাতসহ গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় ইংরেজ তার ডান্ডি শহরকে রক্ষা করতে গিয়ে ধ্বংস করে দেয় আমাদের তাঁতশিল্প। তখন সেই সব তাঁতির জীবিকার উত্স হয় কৃষি। ১৮৯৮ সালে প্লেগ মহামারির পরপরই দেখা দেয় ভূমিকম্প। যা গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো হয়ে ওঠে। নাগরিক অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারে শহরের নিম্নবিত্ত মানুষ গ্রামে গিয়ে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করা শুরু করে এবং মধ্যবিত্তরা পতিত জমিসহ সব জমি চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসে। সেবারও মায়ের আঁচল পেতে আমাদের রক্ষা করে কৃষি।

এরপর ২০০২ সালে আদমজী বন্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা থেমে যায়। আমরা ক্রমান্বয়ে পশ্চাত্সংযোগ বিচ্ছিন্ন শিল্পে অধিক মনোযোগী হয়েছি; কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে কৃষির বৈচিত্র্য রক্ষা ও বাড়ানো এবং স্থানীয় বাজারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। অগ্রাধিকার দিতে হবে কৃষি প্রক্রিয়াকরণে এবং গড়ে তুলতে হবে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন।

আমরা লক্ষ করেছি, এই লকডাউনে পরিবেশের ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এটাকে ধরে রাখতে সবুজ অর্থায়নের কথা চিন্তা করতে হবে। জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্যকে মাথায় রেখে ফিরতে হবে জৈব কৃষিতে। ‘জাতীয় জৈব কৃষিনীতি ২০১৬’ প্রণীত হলেও তা বাস্তবায়নে বাজেটে আলাদা কোনো বরাদ্দ থাকে না। এবারেও মাননীয় অর্থমন্ত্রীর খাতওয়ারি পেশকৃত বাজেটে কৃষিতে থোক বরাদ্দ দিয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। যার মধ্যে কৃষি, মত্স্য ও প্রাণী, পরিবেশ ও বন, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় অন্তর্ভুক্ত। এই খাতে মোট বরাদ্দ ২৯ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা। যার মধ্যে উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ মাত্র ১১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। আমরা যদি কৃষিকে প্রকৃতিবান্ধব করতে না পারি, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের কথা না ভাবতে পারি তাহলে জাতীয় অর্থনীতি বারবার আছাড় খাবে। তাই এবারের বাজেটে কৃষি খাতে কমপক্ষে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। যার অর্ধেকটা কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, সংরক্ষণাগার, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহূত হবে, বাকিটা অবশ্যই জৈব কৃষি বা জলবায়ু সহনশীল স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চায় বিনিয়োগ করতে হবে।

n লেখক :সংস্কৃতি ও উন্নয়নকর্মী