গত ২৫ মে যুক্তরাজ্যের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশি নির্যাতনে মারা যান ৪৬ বছরের জর্জ ফ্লয়েড। জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড ঘিরে আমেরিকা বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। সহিংস বিক্ষোভ পুরো দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই করোনাকালে সবকিছু উপেক্ষা করে বিক্ষোভ চলছে উন্নত দেশগুলোর বড়ো বড়ো শহরে। বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। ইউরোপ ও বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে। এ হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈষম্য ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে তারা। একটু পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাই, ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। তার ঠিক ৯০ বছর পর আমেরিকা থেকে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয় ১৮৬৫ সালে। দাসপ্রথার মূলে ছিল বর্ণবাদ, কেননা কালো মানুষ অর্থাত্ আফ্রিকান-আমেরিকানরা আমেরিকা এসেছিল ক্রীতদাস হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তার একটি ঐতিহাসিক ভাষণ, যা এখন ‘I have a dream’ শিরোনামে আমরা জানি। এ ভাষণে উঠে এসেছে নিগ্রোদের প্রতি অত্যাচারের কথা, তাদের বর্ণবৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা। আমেরিকার সিভিল রাইটস আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটা ছিল মাইলফলক। কিংয়ের স্বপ্নের আমেরিকার সেই রূপকল্প সেদেশেই শুধু নয়—তার বাইরেও মানুষের মনে দাগ কেটেছিল। কিন্তু ১৯৬৮ সালে এ রকমই একটি বর্ণবাদী ঘটনার শিকার হয়ে কিং গুলিবিদ্ধ হয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু সেই বর্ণবাদ মুছে যায়নি আমেরিকার সমাজ থেকে। মাত্র পাঁচ বছর আগে মার্কিন পুলিশের হাতে একই কায়দায় নির্মমভাবে নিহত হয় এরিক গার্নার। অথচ সে সময় একজন কৃষ্ণাঙ্গ (বারাক ওবামা) প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় ছিলেন। জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ নমুনা যা বিশ্ববাসী দেখেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে। ফ্লয়েডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দ্রুত আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমেরিকাতে করোনা ভাইরাসের প্রচণ্ড প্রকোপ থাকা সত্ত্বেও কেন হাজার হাজার আমেরিকান জীবনের কোনো তোয়াক্কা না করেই রাস্তায় নেমে এসে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করল? এ প্রশ্নের উত্তরে কিছু কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে।
প্রথমত, পশ্চিমা বিশ্বে বর্ণবাদ এবং বৈষম্য টিকে থাকার পেছনে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের সুযোগ রয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ বিভাজন আরো প্রকট করে এর সুবাদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাদাদের একতরফা করে ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচিত হয়ে আসা বিচিত্র নয়। কেননা, ৩০ কোটির অধিক জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আধিক্য বেশি, শতকরা ৭২ দশমিক ৮১ ভাগ, আর কৃষ্ণাঙ্গ মাত্র ১২ দশমিক ৫১ ভাগ।
দ্বিতীয়ত, ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনি এজেন্ডায় ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ‘হোয়াইট ন্যাশনালিজম’। মানুষ এ হোয়াইট ন্যাশনালিজমের প্রতি সমর্থন দিয়েছিল বলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প মূলত এমন কিছু বিষয়কে সামনে এনেছেন, যা বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক, কিন্তু আমেরিকার সাদা মানুষের স্বার্থের পক্ষে যায়। এর ফলে একদিকে কৃষ্ণাঙ্গরা একধরনের আতঙ্কে ভুগছেন। ফলে আন্দোলনের মাত্রা প্রকট হয়েছে।
তৃতীয়ত, মহামারি রূপ নেওয়া করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। মৃত্যুর হারের দিক থেকে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তিন গুণ বেশি মারা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনি। এএমপি রিসার্চ ল্যাবের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান (২০ মে, ২০২০)। এই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১ লাখ করোনা রোগীর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুর হার ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ। যেখানে মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের মৃত্যুর হার ২২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মার্কিন এশিয়ানদের মৃত্যুর হার ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। আলজাজিরার (১০ এপ্রিল, ২০২০) ‘Coronavirus is disproportionately killing African Americans- Early data from the US coronavirus pandemic exposes how systemic racism and inequality put minority groups at risk’—এই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করায় তাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বেশি। অন্যদিকে অবহেলিত কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে ভুগছে, কারণ তাদের জন্য স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত সুবিধা রাখা হয়নি।
তাই বলা যায়, উগ্র বর্ণবাদ ও সন্ত্রাসবাদ সব সময়ই বিশ্ব শান্তি, প্রগতি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকাঠামোয়, অর্থনীতিতে, উত্পাদনে, বণ্টনে এবং ক্ষমতার বিন্যাসের পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। মানুষের চিন্তায়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে, মানুষের মজ্জায় এবং মানুষের মানসিকতায় বর্ণবাদী চেতনা মুছে ফেলে নব উদ্যমে ভালোবাসার এক পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়