করোনাকালে গুরুতর অসুস্থ কোনো রোগীকে চিকিত্সা না দিলে এবং তাতে ঐ রোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, প্রতিদিনই গণমাধ্যমের খবরে উঠে আসছে চিকিত্সা না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা। সেজন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল গুরুতর অসুস্থ কোনো রোগীকে চিকিত্সাসেবা প্রদানে অনীহা দেখালে এবং তাতে ঐ রোগীর মৃত্যু ঘটলে তা অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনা দেওয়া হলো। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের একক ভার্চুয়াল বেঞ্চ গতকাল সোমবার এই আদেশ দেন। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যাতে কোভিড-১৯ ও নন-কোভিড সব রোগীকে পরিপূর্ণ চিকিত্সাসেবা প্রদান করে সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে নন-কোভিড রোগীদের চিকিত্সা প্রদানের জন্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেসব নির্দেশনা প্রদান করেছে তা তারা যথাযথভাবে প্রতিপালন করছে কি না এবং যদি না করে থাকে তাহলে সেসব ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা প্রতিবেদন আকারে ৩০ জুন হাইকোর্টকে অবহিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাস্টিস ওয়াচ ফাউন্ডেশনের পক্ষে ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলনসহ পাঁচ আইনজীবীর দায়ের করা পৃথক তিনটি রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট এ আদেশ দেয়। এছাড়া হাইকোর্ট ৫০ শয্যা ও তদূর্ধ্ব শয্যাবিশিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালসমূহে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের চিকিত্সার জন্য পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছে।
নির্দেশনাসমূহ: হাইকোর্ট আদেশে বলেছে, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে অধিকতর জবাবদিহিমূলক ও বিস্তৃত করতে হবে। ভুক্তভোগীরা যাতে এ সেবা দ্রুত ও সহজভাবে পেতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। কোন্ হাসপাতালে আইসিইউতে কত জন রোগী চিকিত্সা নিচ্ছেন এবং কতটি আইসিইউ শয্যা কী অবস্থায় আছে তার আপডেট প্রতিদিনের প্রচারিত স্বাস্থ্য বুলেটিন এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ভুক্তভোগীদের যোগাযোগের জন্য পৃথকভাবে ‘আইসিইউ হটলাইন’ নামে পৃথক হটলাইন চালু এবং হটলাইন নাম্বারগুলো প্রতিদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষত টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। আইসিইউ চিকিত্সার ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যেন মাত্রাতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ফি আদায় না করতে পারে সে বিষয়ে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া হাইকোর্ট অক্সিজেন সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য এবং রিফিলিংয়ের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। আদালত আদেশে বলেছে, খুচরা বিক্রেতাদের অক্সিজেন সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য প্রতিষ্ঠান/দোকানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃত্রিম সংকট রোধে চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র এবং রোগীর পরিচয়পত্র ব্যতীত অক্সিজেন সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে। এ ব্যাপারে মনিটরিংয়ের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হলো।
আদালত বলেছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাসমূহ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন করছে কি না সে বিষয়ে তারা ১৫ দিন পর পর একটি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে পাঠাবে। ঐসব প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৫ দিন পর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এই আদালতে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলো। এছাড়া ৫০ শয্যার অধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে ২৪ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত কত জন কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীকে চিকিত্সা প্রদান করা হয়েছে সে সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ৩০ জুন আদালতে দাখিল করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।