বিশ্বের অনেক দেশ যখন দীর্ঘ কয়েক মাস যাবত্ প্রতিটা মুহূর্তের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় মহামারি কোভিড-১৯-কে অনেকটা আয়ত্তে নিয়ে এসেছে, সে সময় বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সংক্রমণের প্রতিদিনের ঊর্ধ্বগতি আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কোভিড-১৯-এর প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অর্থনীতির চাকাকে সক্রিয় রাখার সঙ্গে সঙ্গে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা সারা বিশ্বের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। আর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি এক মহাচ্যালেঞ্জ। করোনা ভাইরাসের মতো মহামারি দমনে বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে সঠিক পদক্ষেপ আর কঠিন নিয়মনীতি পালনের কোনো বিকল্প নেই। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, উত্তর কোরিয়া, জার্মানসহ বেশ কটি দেশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। গত ১৪ জুন ২০২০ তারিখের হিসাব মতে ১২টি দেশ সম্পূর্ণভাবে করোনামুক্ত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা বিশ্বের রোল মডেল হলেও এটি স্বীকার করে নিতে হবে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনায় ভরা। এজন্য বাংলাদেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সেক্টরকে। তার পরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আর চিকিত্সক ও চিকিত্সাকর্মীদের প্রাণান্তকর চেষ্টায় কিছুটা হলেও গত মাসে সামাল দিয়ে উঠবার চেষ্টা করলেও তা এখন অনেকটা স্বপ্নবিলাস বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
কোভিড ব্যবস্থাপনায় টেস্ট, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিকল্প কিছুই নেই। এটা সুস্পষ্ট যে, যে দেশগুলো মহামারির প্রারম্ভে বিপুল সংখ্যায় টেস্ট করেছে, তারপর যারা সংক্রমিত রোগীর সংস্পর্শে এসেছে তাদের সন্ধান (কন্টাক ট্রেসিং) করেছে এবং যথাযথ চিকিত্সা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েছে তারাই কোভিড-১৯-এর বিস্তারকে কমিয়ে আনতে সবচেয়ে বেশি সফলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটা বিফল হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রেও আমরা সফলতা অর্জন করতে পারিনি। আর এর কারণেই বিপুলসংখ্যক কোভিড-১৯ রোগী ও নিয়মিত রোগীর চাপে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন হুমকির মুখে। সরকার করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ২ হাজার ডাক্তার ও ৫ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ দেওয়ার পরেও রোগীদের পাশাপাশি আমাদের চিকিত্সকরা মহাচ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এমতাবস্থায় অতি দ্রুত হাসপাতাল ও রোগী ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক উদ্ভাবনী পরিবর্তন না আনতে পারলে আমরা কোনোভাবেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব না। প্রতিদিনের বিপুলসংখ্যক নতুন করোনা রোগীর এবং নিয়মিত রোগীর চিকিত্সা ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখতে হলে আমাদের জনস্বাস্থ্য সেবা ও ব্যবস্থাপনাকে যতটুকু সম্ভব দ্রুততম সময়ে পুনর্বিন্যাসের বা ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্প্রতি প্রকাশিত গাইডলাইনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিনির্ধারণ না করে কাউকে খুশি কিংবা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করা কোনোভাবেই যে সম্ভব নয়, তা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রটির দিকে তাকালেই অনুধাবন করা যায়। কোভিড-১৯ চিকিত্সা ব্যবস্থাকে ফলপ্রসূ করতে হলে সর্বাগ্রে দরকার চিকিত্সক ও চিকিত্সাকর্মীদের সুরক্ষা এবং তাদের স্বল্পসময়ে যথাযথ দক্ষতা উন্নয়নে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা। আর কোভিড-১৯ রোগীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে তাদের পরিবর্তিত জীবনযাপনের সঙ্গে তারা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন তার ব্যবস্থা করা। দক্ষ ট্রিয়েজ (রোগীকে গুরুত্বানুযায়ী মূল্যায়ন) পদ্ধতি কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যসেবার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে রোগীর অন্তঃপ্রবাহ ব্যবস্থাপনাসহ, দক্ষতার সঙ্গে গুরুতর রোগীর চিকিত্সা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সম্পদ বণ্টন, কেস ম্যানেজমেন্ট এমনকি জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা প্রণয়ন সহজতর হবে। ট্রিয়েজ পদ্ধতি হাসপাতালগুলোতে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারলে স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করাও সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কোভিড ও নিয়মিত রোগীর চিকিত্সাও অনেক সহজ হবে। কোভিড-১৯-এর নমুনা সংগ্রহ, নমুনা যথাযথভাবে ল্যাবে পাঠানো আর দ্রুততার সঙ্গে নির্ভুল টেস্ট রিপোর্ট নিশ্চিত করাও খুবই জরুরি। প্রয়োজন টেস্টকে সবার আওতার মধ্যে নিয়ে আসা আর বিপুল সংখ্যায় টেস্ট করা। আমরা মনে করি, কমিউনিটিতে সংক্রমণের পরিসংখ্যান জানাটা এখন অত্যন্ত জরুরি। ক্লিনিক্যাল টেস্টের জন্য আরটি পিসিআর টেস্ট ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ভেলিডেটেড এন্টিজেন ও এন্টিবডি র্যাপিড কিট ব্যবহারের কথাও এখন ভাবা উচিত। কোভিড-১৯ একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় আর আন্তর্জাতিক কারিগরি ও চিকিত্সা সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। দেশগুলোর মধ্যে তথ্যের আদানপ্রদান, জিন সিকোয়েন্সিং থেকে শুরু করে ড্রাগ ডিসকভারি সবকিছুতেই বাংলাদেশের সম্পৃক্ত হওয়া খুবই প্রয়োজন। কোভিড-১৯-কে পরাজিত করতে হলে আমাদের প্রতিটি মুহূর্তকে সঠিকভাবে সদ্ব্যবহার করতে হবে।
কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আমাদের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দলমত সব ভুলে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে একটি সুপরিকল্পিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে ও বাইরে অসংখ্য স্বাস্থ্যকর্মী, বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও অনেক বরেণ্য চিকিত্সক বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, সেই সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করার যে সুমহান ইতিহাস রেখে গেছেন, সেটাকেই এখন আমাদের সংকট মোকাবিলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ বিগত শত বছরে এমন অনিশ্চিত ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়নি। তবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কষ্ট-শোকে, যুদ্ধ-দ্রোহে গড়ে ওঠা বাঙালি এই মহাসংকটকে জয় করবে।
n লেখক :প্রবাসী বিজ্ঞানী