ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা

করোনা ভাইরাস আমাদের জীবনধারা, চলন রীতিসহ অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। আর যে বিষয়গুলো বদলাতে করতে পারেনি তার মধ্যে অন্যতম হলো— মানুষের যুদ্ধংদেহি মনোভাব। তাই তো করোনার এই মহাসংকটের মধ্যেও আমরা আরেক সংকটের জন্ম দিতে তত্পর। পৃথিবীর নামকরা কয়েকটি রাষ্ট্রের দিকে তাকালে এ কথার প্রমাণ খুব সহজেই পাওয়া যায়। বিশেষ করে চীন-ভারতের চলমান দ্বন্দ্ব্ব আন্তর্জাতিকমহলে বেশ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একে তো করোনা মহামারি দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে, তার মধ্যে সীমান্তবর্তী দুইটি দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক চরমে পৌঁছেছে। চীনের সঙ্গে লাদাখ নিয়ে দ্বন্দ্ব্ব, নেপালের সঙ্গে কালাপানি-লিপুলেখ-লিম্পিয়াধুরা সংকট। চীন-ভারত দ্বন্দ্ব যদি আলোচনার মাধ্যমে প্রশমন না হয় তবে এই দেশগুলো বড়ো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। প্রযুক্তির এই যুগে দুইটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যুদ্ধে জড়ালে যে কতটা ক্ষতি হবে তা বর্ণনাতীত। চীন-ভারত রেষারেষির কারণ বিশ্লেষণ করলে চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব্বের গন্ধ পাওয়া যায়। চীন যে আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব মোড়লের স্থান দখল করতে চায় সে কথা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যেটা আমেরিকার জন্য বড়ো দুশ্চিন্তার কারণ। তাই আমেরিকা বিশ্ব মঞ্চে তাদের প্রথম চেয়ার ধরে রাখতে চীনের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। সে জন্য তারা বেছে নিয়েছে চীনের সীমান্ত ঘেঁষা দেশ ভারতকে। ভারত-আমেরিকার সম্পর্ককে ভালোভাবে দেখছে না প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীন। যেটার রেষ ধরেই চীন ভারতকে দমিয়ে রাখতে সীমান্ত বিরোধকে সামনে নিয়ে এসেছে। করোনা মহামারির মধ্যেও ভারত যখন নেপালের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছে ঠিক তখনই চীনের সঙ্গে লাদাখ (এলএসি) সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় দেড় মাস ধরে চলমান এই বিরোধের চিত্র বলছে দুই দেশের সম্পর্ক দিন দিন তিক্ততায় পরিণত হচ্ছে।

প্রথমদিকে দুই দেশের বিবাদ মীমাংসা করতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জাতিসংঘের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, সীমান্তে সেনা মোতায়েন ও চীনা প্রেসিডেন্টের যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলা থেকে যুদ্ধেরই আভাস পাওয়া যায়। যদি যুদ্ধ হয় তবে সেটা পুরো বিশ্বের জন্য হতাশাজনক এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জন্য দুশ্চিন্তার কারণ তো বটেই। অন্যদিকে, নেপালেও ভারতের দাবি উপেক্ষা করে দাবিকৃত ও বিতর্কিত ভূখণ্ড মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধান সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে নেপাল সরকার। গত মঙ্গলবার (৯ জুন) রাতে নেপালের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে দেশটির নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র এবং নতুন জাতীয় প্রতীক নির্ধারণের জন্য সংবিধান সংশোধনের এ অনুমোদন দেয়। ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি অনুযায়ী নেপাল এই দাবি করে আসছিল। ভারত সেই দাবি অস্বীকার করে বিতর্কিত সীমানায় সড়ক নির্মাণ আরম্ভ করেছিল। এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে নেপালের বিরোধ তুঙ্গে ওঠেছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো মাসের পর মাস দ্বন্দ্ব্বে জড়িয়ে থাকুক এটা আমরা চাই না। তবে, আমাদের স্বস্তির খবর ছিল চীন ও ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধানগণ যুদ্ধাবস্থা বিলোপ করতে ৬ জুনের বৈঠক। পূর্ব লাদাখের লেহ জেলার অন্তর্গত প্যাংগং লেকের দক্ষিণ প্রান্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার (এলএসি) লাগোয়া চুসুলে এই বৈঠকে অংশ নেয় দুই দেশের কোর কমান্ডাররা।

কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে আলোচনায় বসেছিল দুই দেশ। কিন্তু, সর্বশেষ কোর কমান্ডারদের আলোচনায়ও সংঘাতের অবসান করতে পারেনি। কিন্তু শুক্রবার (১২ জুন) বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, লাদাখ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত গোটা নিয়ন্ত্রণ রেখায় বাড়তি সেনা মোতায়েন করে চীন। সীমান্তে উত্তাপ কিছুটা কমলেও তা আবার বৃদ্ধি পায়। এই উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়ে গত সোমবার সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। সোমবার (১৫ জুন) রাতে লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। যাতে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত ও চীনের বেশ কয়েক জন সেনা আহত ও নিহত হয়েছে।

১৯৭৫ সালে অরুণাচল প্রদেশের টুলুং লায় সংঘর্ষের পর সোমবার এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে দুই দেশের নেতৃবৃন্দ ফের আলোচনায় বসেছে। চীন-ভারত দ্বন্দ্ব্বের প্রভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হচ্ছে। শুধু করোনাকালে নয়, যুদ্ধ আসলে কোনো কালেই কাম্য নয়। তবে করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ হলে তার ক্ষতি কাটিয়ে উঠা খুব কঠিন হবে। ভারতের চীনের সঙ্গে লাদাখ, পাকিস্তানের সঙ্গে কাশ্মীর এবং নেপালের সঙ্গে কালাপানি-লিপুলেখ-লিম্পিয়াধুরা সংকট নিরসনে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের শান্তি উদ্যোগ এই বিরোধকে সুসম্পর্কে রূপ দিতে পারে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সীমান্তে গোলাগুলি নয়, শান্তি বিরাজ করুক। শান্তির এমন আশা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মানুষেরই নয়, পুরো পৃথিবীবাসীর।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়