খুলনায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় তার স্বজনদের হামলায় চিকিত্সক আব্দুর রকিব খানের মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং হামলার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও শাস্তি এবং চিকিত্সকদের নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন চিকিত্সকরা। এদিকে, বিএমএর এক সভায় হামলার সঙ্গে জড়িত সব সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার ও খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত খুলনা জেলার সব চিকিত্সাসেবা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে কোভিড-১৯ হাসপাতাল ও খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি সেবা চালু থাকবে বলে জানিয়েছে বিএমএ।
ডা. আব্দুর রকিব খানের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল বুধবার তার ছোটো ভাই সাইফুল ইসলাম চার জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ৮-১০ জনকে আসামি করে খুলনা থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত আব্দুর রহিম নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে। মৃত রোগীর স্বজনদের হামলায় নগরীর গল্লামারীর রাইসা ক্লিনিকের পরিচালক ডা. আব্দুর রকিব খানের মৃত্যুর প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে নগরীর সাত রাস্তার মোড়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিওএ) ও বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল প্রাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমপিএ) বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনা বিএমএর সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম। এতে চিকিত্সক নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাইসা ক্লিনিকের পাশেই গল্লামারী পুলিশ ফাঁড়ি, কিন্তু ডা. রকিবকে হামলার সময় পুলিশ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। কর্মস্থলে চিকিত্সকদের কোনো নিরাপত্তা নেই। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সকরা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছে। চিকিত্সকদের ওপর হামলা একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা বা ডাক্তার-নার্সদের ওপর চড়াও হওয়া একটা হুজুগে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে রকিবের মতো গরীবের ডাক্তারকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা ড. রকিবের ওপর হামলার ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও শাস্তি এবং চিকিত্সকদের নিরাপত্তার দাবি জানান। অন্যথায় কঠোর আন্দোলন করার হুঁশিয়ারি দেন তারা। সমাবেশ থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চিকিত্সকদের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ সময় বক্তৃতা করেন বিএমএ খুলনার সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. মেহেদী নেওয়াজ, বিপিএইচসিডিওএর খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ডা. গাজী মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. শওকাত আলী লস্কর প্রমুখ।
এদিকে গতকাল বুধবার দুুপুরে বিএমএর এক জরুরি সভায় খুলনা বিএমএ, বিপিএমপিএ ও বিপিএইচসিডিওএ অফিসসহ সব স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন এবং সব চিকিত্সক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কালো ব্যাজ ধারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সভায় খুলনা বিএমএর সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. মামুনূর রশিদকে আহ্বায়ক, ডা. মো. সওকাত আলী লস্করকে যুগ্ম আহ্বায়ক, ডা. সুমন রায়কে সদস্য সচিব এবং ডা. ইউনুচউজ্জামান খান তারিম, ডা. দেবনাথ তালুকদার রনি ও ডা. এস এম তুষার আলমকে সদস্য করে আন্দোলন মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়।
খুলনা থানার ওসি আসলাম বাহার বুলবুল জানান, নিহত ডা. আব্দুর রকিব খানের ছোটো ভাই সাইফুল ইসলাম গতকাল বাদী হয়ে চার জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ৮-১০ জনকে আসামি করে খুলনা থানায় মামলা দায়ের করেছেন। এরই মধ্যে আব্দুর রহিম (৩৮) নামে মামলার এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুন সিজারিয়ানের জন্য নগরীর মোহাম্মদ নগরের পল্লবী সড়কের বাসিন্দা আবুল আলীর স্ত্রী শিউলী বেগমকে রাইসা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ঐদিন বিকাল পাঁচটায় তার অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর প্রথমদিকে বাচ্চা ও মা দুই জনই সুস্থ ছিলেন। কিন্তু পরে শিউলীর রক্তক্ষরণ শুরু হলে ১৫ জুন সকালে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেও চিকিত্সকরা রোগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে না পেরে তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। ১৫ জুন রাতে ঢাকায় নেওয়ার পথে শিউলী বেগম মারা যান । ঐ ঘটনার জেরে ১৫ জুন রাত পৌনে ৯টার দিকে শিউলীর আত্মীয়স্বজনরা রাইসা ক্লিনিকে গিয়ে ক্লিনিকের মালিক ডা. রকিবকে মারধর করেন। এতে রকিবের মাথার পেছনে জখম হয়। তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে গাজী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ডা. রকিবের মৃত্যু হয়।