হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কার্যালয় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির মুঈনে মুহতামিম বা সহকারী পরিচালক আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে আল্লামা আহমদ শফী মাদ্রাসাটির মুহাদ্দিস মাওলানা শেখ আহমেদকে দায়িত্ব দিয়েছেন। মহাপরিচালক হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করবেন বর্তমান মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলামীর আমির মাওলানা শাহ আহমদ শফী নিজেই। গতকাল বুধবার আল্লামা আহমদ শফীর সভাপতিত্বে হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসায় শুরা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে করে শফীর মৃত্যু বা অসুস্থতার পর হেফাজতের আমির হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেল আল্লামা বাবুনগরীর। আল্লামা আহমদ শফীর ছেলে ও হাটহাজারী মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষা পরিচালক মাওলানা আনাস মাদানী এসব তথ্য জানিয়েছেন।
সকাল ১০টা থেকে বেলা সোয়া ৩টা পর্যন্ত শুরা কমিটির বৈঠক চলে। বৈঠক শুরুর আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় পর দুপুর পৌনে ১টার দিকে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সেখানে তলব করা হয়। তাকে বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো জানিয়ে দেওয়া হয় এবং পদত্যাগপত্র দিতে বলা হয়।
এদিকে শুরা বৈঠক তথা মাদ্রাসার শীর্ষ পদে শাহ আহমদ শফীর উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে তত্পরতায় প্রকাশ্যে আসা দুই পক্ষের দ্বন্দ্বে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে এমন শঙ্কায় হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের বিপুলসংখ্যক ফোর্স মোতায়েন ছিল। মাদ্রাসার একটি পক্ষ বলছে, বৈঠকে উপস্থিত হয়ে স্বেচ্ছায় নিজ পদ থেকে ইস্তফা দেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। অন্যরা বলছেন বাবুনগরীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ যাতে তিনি পরবর্তী হেফাজতের মূল দায়িত্বে না আসতে পারেন। পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে হেফাজতে ইসলামের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর আমির হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব গতকাল ইত্তেফাককে জানান, মাদ্রাসার বর্তমান পরিচালক ও মুহতামিম হিসেবে হুজুরই (আল্লাহ শাহ আহমদ শফী) থাকছেন। তবে তার অবর্তমানে সহকারী পরিচালক মাওলানা শেখ আহমদই ঐ মাদ্রাসার পরিচালক হবেন। আর হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক হলে পদাধিকার বলে মাওলানা শেখ আহমদ হেফাজতে ইসলামের আমির হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদ্রাসার পরিচালক ও হাইয়াতুল উলাইয়া কোচেয়ারম্যান আল্লামা আব্দুল কুদ্দুস, ফরিদাবাদ মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম ও বেফাক যুগ্মমহাসচিব মুফতি নুরুল আমিন, ঢাকার খিলগাঁও মাখজানুল উলুম মাদ্রাসার মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া উবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরী, হাটহাজারীর আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিউচ্ছুন্নাহ মেখল মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা নোমান ফয়জী, হাটহাজারীর ফতেপুর মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা মাহমুদুল হাসান ফতেপুরী, জামেয়া নাজিরহাট বড় মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক মাওলানা সলিম উল্লাহ এবং হাটহাজারীর শিকারপুরের বাথুয়ার মাওলানা ওমর ফারুক চৌধুরী।
শতবর্ষী প্রবীণ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। সর্বশেষ গত ১৫ জুন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউ থেকে চিকিত্সা নিয়ে বের হওয়ার পর পরই দারুল উলুম মাদ্রাসার শুরা কমিটির বৈঠক আহ্বান করেন হেফাজত আমির।
দারুল উলুম হাটহাজারীতে মুহাদ্দিস হিসেবে ২০১৮ সালের মে মাসে যোগ দেন মাওলানা শেখ আহমদ। তিনি এর আগে চট্টগ্রামের উবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শেখ আহমদ আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ঘনিষ্ঠ খলিফা এবং আনাস মাদানীর কাছের লোক হিসেবে পরিচিত তিনি।
বাবুনগরী বলেন, বৈঠকের বিষয়ে আগে তাকে কিছু জানানো হয়নি। বৈঠক শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টা পর তাকে ডেকে তার কাছে মাদ্রাসার বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। বৈঠক থেকে বেরিয়ে তিনি অব্যাহতির কথা জানতে পারেন—যা সঠিক নয়। এর আগে হেফাজতের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা মঈনউদ্দিন রুহি ইত্তেফাককে জানান, বাবুনগরী স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেন।