বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে এখন মানুষ অনেকটা ঘরবন্দি। ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্পকারখানা প্রায় বন্ধ। গণপরিবহনও সীমিত। সব থমকে গেলেও মাদক ব্যবসায়ীরা থেমে নেই। দেশ জুড়ে চলছে রমরমিয়ে মাদকের কারবার। বারগুলো বন্ধ থাকার সুযোগে নীরবে পাড়া-মহল্লায় আরো বেশি মাদক সরবরাহ করছে মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা। লকডাউনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদক পাচারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি চক্র। এমন খবরই ছাপছে আমাদের পত্রিকাগুলো।
কৌশলে মাদক সংগ্রহ এবং মাদক বিক্রেতাদের মাদক বিক্রি সবই চলছে বেশ দাপটের সঙ্গে। কেবল ধরন পালটেছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এ সমস্যার সমাধান কখনই হয়নি বরং বারবারই ব্যাপকতা বেড়েছে। মাদক সমাধানে কারো তাগিদ আছে তাও মনে হয় না কখনো। তাই মহাসংকটেও পণ্যবাহী ট্রাকে, পরিবহনে, নদীপথে আসছে মাদকের চালান। পাড়া মহল্লায় অনেকটা প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা। মাদক ব্যবসা নিয়ে ঘটছে সংঘর্ষও। বিষাক্ত মদ্যপানে মানুষও মরছে। গত এক মাসে ২১ জন মাদকাসক্ত বিষাক্ত মদপানে মারা গেছে।
মাদক আর মাদকাসক্ত মানুষ আমাদের সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছে। এদের কর্মকাণ্ডে আমরা, আমাদের দেশ প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবুও দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ করা হয় না? প্রশ্ন হলো, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন কী করছেন তারা? দু-চারজন চুনোপুঁটিকে ক্রসফায়ারের আওতায় আনলেই মাদক রোধ হবে এমনটা না। মাদকের মূলোত্পাটন করতে হবে। গডফাদারদের ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক শুধু এক জন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে।
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মাদক পাচারকারীরা আমাদের দেশে মাদকের বাজার তৈরি করে নিয়েছে। এ জন্যই হয়তো দেশ মাদকে সয়লাব হচ্ছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে দেশের অনেক রাঘববোয়াল জড়িত। তাই ওদের টিকিটিও ছোঁয় না কেউ। যা হওয়ার তাই হচ্ছে দেশে। আমরা দেশবাসী দুর্ভাগা বলেই আমাদের যুবসমাজ সহজে মাদক হাতের নাগালে পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত আইনের তেমন শাসন সক্রিয় নয় বলে আমাদের সন্তানরা দিন দিন অধঃপতনে নিপতিত হচ্ছে। তবু মাদক ব্যবহার কমেনি। ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, প্যাথেডিনের ব্যবসা রমরমা। নারী, পুরুষ উভয় শ্রেণির মধ্যে মাদক সেবন প্রবণতা বাড়ছে। ডিশ এন্টেনার যুগে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন এ দেশের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীকে, নেশাগ্রস্ত ও পশুপাখি সহযোগে বাস করার মানসিকতা তৈরি করছে। ঘুমের ওষুধ, হেরোইন, গাঁজা, এমনকি কুকুর মারার ইনজেকশন সেবন করছে মাদকসেবীরা। বিষ শরীরে ঢুকিয়ে নেশা করার মতো অভ্যাস গড়ে উঠছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে।
মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন শুধু নগর-মহানগরেই সীমাবদ্ধ নেই, গ্রামবাংলা পর্যন্ত মাদক এখন সহজলভ্য। হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। তবে মাঝে-মধ্যে মাদকদ্রব্য বহনের দায়ে কেউ কেউ ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। দৃশ্যের আড়ালে এই যে অদৃশ্য মহাশক্তিধর চক্রটির জন্যই মাদকের ক্রমবিস্তার রোধ হয়ে উঠেছে অসম্ভব। আমরা মনে করি মাদক সংশ্লিষ্ট চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়াল পর্যন্ত প্রত্যেকের ব্যাপারেই আইন প্রয়োগে কঠোরতা দেখাতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগই মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে সহায়ক হতে পারে। মাদক আমাদের সমাজকে কীভাবে কুরে কুরে খাচ্ছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সমস্যা সমাজ ও রাষ্ট্রের। দেশের উদীয়মান যুবসমাজ যদি সমাজ বৈশিষ্ট্যের বিরূপতার শিকার হয় তাহলে দেশের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। দেশকে রক্ষা করতে হলে সংশ্লিষ্টদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিস্থিতি উত্তরণে মাদকাসক্তি, যৌনাচার এবং পর্নোগ্রাফি প্রতিরোধে সুচিন্তিত ও সমন্বিত কর্মপন্থা গ্রহণ করা দরকার। একটি প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার আগে আমাদের সবার দায়িত্ব হবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা।
আমরা মনে করি, এদেশে মাদকাসক্তি স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিচারহীনতার কারণে। দেশের আনাচেকানাচে তাই মাদকদ্রব্য কেনাবেচা চলে অনেকটা দাপটেই। অধিকাংশ মাদকদ্রব্য আসে বিদেশ থেকে অবৈধ পথে। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্য সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে এত অনায়াসে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য পাচার হয়ে আসা সম্ভব নয়। সীমান্তপথে মাদক চোরাচালান ও দেশের ভেতরে মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা অত্যন্ত কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। আমরা এও বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের কাছে মাদক সিন্ডিকেট মোটেও শক্তিশালী নয়। তাই রাষ্ট্র বিষয়টা গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে—এটাই প্রত্যাশা।
n লেখক :গবেষক