ভারত-চীন সীমান্তের লাদাখে গত সোমবার রাতে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার নিহত হবার ঘটনায় কূটনৈতিক উত্তেজনা এখনো তুঙ্গে অবস্থান করছে। বেইজিং ও দিল্লি বিষয়টি নিয়ে আর সংঘাত না বাড়িয়ে শান্তি বজায় রাখতে সম্মত হলেও দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিতর্কিত এলাকা থেকে সেনা সরাতে বেইজিং গররাজি বলে আনন্দবাজার পত্রিকা তার নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে এক রিপোর্টে জানিয়েছে। অন্যদিকে, গুলিবর্ষণ ছাড়াই এত ভারতীয় সেনার মৃত্যু কীভাবে হলো, এই প্রশ্ন যখন চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছিল তখন যে ‘অদ্ভুত’ অস্ত্র দিয়ে চীনা সেনারা মারামারি করেছিল তার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা গেছে, চারদিকে লোহার পেরেক বসানো এক ধরনের ব্যাট দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অংশ নিয়েছিল তারা। ধারালো পেরেক শরীরে ঢুকে ব্যাপক রক্তক্ষরণের ফলে তাদের মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, গলওয়ান উপত্যকায় সেনা সরানো নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ফের দুই দেশের মেজর জেনারেল পর্যায়ের বৈঠক হয়। গলওয়ানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে যে জায়গায় সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল, সেই এলাকাতেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শান্তি ফেরানোর শর্ত হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে সেনা সরানোর দাবি করা হলে চীন অনড় থাকে। পরবর্তীতে আবারও দুই পক্ষের বৈঠকে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা হবে।
গত সোমবার রাতে পূর্ব লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনে সেনাদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। ভারতের পক্ষে এক কর্নেলসহ ২০ জন সেনা জওয়ান নিহত হন। আর চীনের দিকে ৪৩ জন হতাহত বলে ভারতীয় সেনা সূত্র উদ্ধৃত করে একাধিক সংবাদ সংস্থা দাবি করে। তবে চীন হতাহতের কথা স্বীকার করলেও সেই সংখ্যা সঠিক কত, তা এখনো স্পষ্ট করেনি।
ভারতের দাবি, ভারতের দিকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কয়েক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে চীনের সেনা। তাই নিয়েই সংঘর্ষের সূত্রপাত। সেই সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার জন্যই দুই পক্ষের মধ্যে দর কষাকষি চলছে। গলওয়ানের পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এই সংঘর্ষ ‘পূর্ব পরিকল্পিত’ বলে ওয়াং ই-র কাছে অভিযোগ জানান তিনি। কিন্তু তার পরও গতকাল গালওয়ানে বৈঠকে বেইজিংয়ের অনড় অবস্থানের জেরে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে বলে মনে করছে কূটনৈতিক শিবির।
যে অস্ত্রে হামলা :প্রায় চার ফুট লম্বা লোহার রড। তার মাথার দিকে এক থেকে দেড় ফুট অংশে সারি সারি পেরেকের মতো ধারালো কাঁটা লাগানো। এ রকমই বেশ কিছু কাঁটা লাগানো লোহার রড উদ্ধার হয়েছে গলওয়ানের সংঘর্ষস্থল থেকে। ভারতীয় সেনাবাহিনী জানায়, ঐ অস্ত্র দিয়েই চীনা বাহিনী আক্রমণ করেছিল ভারতীয় সেনাদের। ‘ক্লোজ কমব্যাট’ বা হাতাহাতি করতে গিয়ে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার আগ্নেয়াস্ত্রর থেকেও বেশি প্রাণঘাতী বলে অভিযোগ করেছে ভারত। ভারতীয় সেনারা বলেছে, প্রায় এক কোম্পানি জওয়ান (১০০ থেকে ১২০ জন) চীনা বাহিনীর সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। সংখ্যায় ভারতীয় জওয়ানদের তুলনায় চীনা জওয়ানদের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ গুণ। ফলে ঐ ধরনের অস্ত্রের বাড়ি খেয়ে একের পর এক ভারতীয় সেনা লুটিয়ে পড়ে। এলোপাতাড়ি আঘাত করে ঐ কাঁটা লাগানো রড দিয়ে।
উত্তেজনা তুঙ্গে :উত্তেজনা প্রশমনের জন্য দ্বিপাক্ষিক কথাবার্তার মধ্যেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সামরিক প্রস্তুতি তুঙ্গে দুই পক্ষেরই। এনডিটিভি জানায়, নয়াদিল্লি থেকে সেনাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ‘লজিস্টিক’ অর্থাত্ রসদ কেনার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে তা স্থানীয় স্তরেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে। তারপরই নিয়ন্ত্রণ রেখায় মোতায়েন সেনাকর্মীদের জন্য ‘বডি আরমার’ বা এক বিশেষ ধরনের বর্মের মতো পোশাক পাঠানো হচ্ছে। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশ যে ধরনের বিশেষ বর্ম পোশাক পরে অনেকটা সেই ধরনের পোশাক। এই পোশাক ধারালো অস্ত্রের আঘাত রুখতে পারবে।
চীন হতাহত নিয়ে নিশ্চুপ :লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় কতজন ভারতীয় সেনা প্রাণ হারিয়েছেন, তা জানিয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। তবে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এতটা সময় কেটে গেলেও নিজেদের সেনাবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কিছু প্রকাশ করেনি চীন। এর ফলে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী অবশ্য মনে করছে, সোমবার রাতে লাদাখের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৩৫ জন চীনা সেনা নিহত হয়েছে। তবে কোনো চীনা কর্তৃপক্ষের মতো দেশটির মিডিয়াও হতাহত বিষয়ে কিছুই বলছে না।
পণ্য বর্জনের ডাক :গালওয়ান সংঘাতের পর দেশব্যাপী চীনা পণ্য বর্জনের ডাক উঠেছে। সেই প্রতিবাদে যোগ দিল দেশটির বণিক সমিতিও। সারা ভারত ব্যবসায়ী সংগঠন নামে ঐ বণিক সমিতি সবার উদ্দেশ্যে চীনা পণ্য বর্জনের আবেদন করেছে। তারা বলছে এটা ভারতের সম্মানের বিষয়। তারকাদের প্রতিও তারা একই আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচারণা চলছে পণ্য বর্জন ইস্যুতে।
চীনা মিডিয়ার বক্তব্য : চীনের গ্লোবাল টাইমস’ তাদের সম্পাদকীয়তে যুক্তি দিয়েছে, হতাহতের সংখ্যা জানালে সীমান্তে উত্তেজনা বেড়ে গিয়ে তা যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সে জন্যই এ ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করেনি চীন সরকার। ওই সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদকের যুক্তি, ‘সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থেই’ হতাহতের সংখ্যা গোপন করা হচ্ছে।
রাহুলকে জবাব জয়শঙ্করের :গলওয়ানে ভারতীয় সেনা নিরস্ত্র অবস্থায় হামলার মুখোমুখি হয়েছিল কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভারতের বিরোধী দলগুলো। সেই অভিযোগের জবাবে পরাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, সীমান্তে মোতায়েন সব বাহিনীই সশস্ত্র থাকে, বিশেষত যখন তারা শিবির ছেড়ে বাইরে যাচ্ছে, সে সময়। গলওয়ানেও ১৫ জুন তাই হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রথা (১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী) মেনে মুখোমুখি সংঘাতের সময় অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। উল্লেখ্য, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গলওয়ানে চীনা হামলার নিন্দার পাশাপাশি কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, ভারতের বীর সেনানীদের কারা নিরস্ত্র অবস্থায় ওই পরিস্থিতিতে ঠেলে দিলেন?
৩৩টি যুদ্ধবিমান কিনছে ভারত : লাদাখ সীমান্তে চলমান ভারত-চীন সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যেই রাশিয়া থেকে আরও ৩৩টি যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। ১২টি ‘সুখোই’ ও ২১টি নতুন ‘মিগ-২৯এস’ যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তের কথা দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়েছে।