ব্যাংকিং খাতে প্রভাবশালী খেলাপি গ্রাহকদের দাপটে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় ভালো গ্রাহকরা কেবলি বঞ্চিত হচ্ছেন। দুর্বৃত্তায়নের শেষ রেখায় অবস্থান করায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে কথা বলতেও আগ্রহ বোধ করছেন না অনেকে। অনিয়মই যেখানে নিয়মে পরিণত করার দুষ্টচক্রের ঘেরাটোপে বন্দি এই ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলবে কে—সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাংকিং খাতে রয়েছেন ভালো গ্রাহকও। যারা গ্যাস-বিদ্যুত্সহ নানা সংকটের পরও নিয়মিত ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করে যাচ্ছেন। এমনকি চলমান বিশ্বমন্দা ও করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক গ্রাহক নিয়মিত কিস্তি দিয়ে যাচ্ছেন। এসব ভালো গ্রাহকের জন্য কোনো কালেই কিছু ছিল না। ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক ভালো গ্রাহকদের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। যার শিরোনাম ছিল—‘যৌক্তিক ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধা,
ভালো গ্রাহকদের জন্য শুধুই ‘থ্যাংক ইউ’!’
রিপোর্টটি প্রকাশের পর একই বছরের ১৬ মে তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্দেশ্যে একটি নির্দেশনা প্রেরণ করে। তাতে বলা হয়, ভালো গ্রাহকদের অর্থাত্ যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছে তাদেরকে ১০ শতাংশ রিবেট সুবিধা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ায় সুধীমহলে এই নির্দেশনা বেশ প্রশংসা কুড়ায়। যদিও বাস্তবে দেখা গেছে, কোনো ব্যাংকই এটি কার্যকর করেনি। মানে কোনো গ্রাহককেই তারা আর ভালো গ্রাহক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেনি। এর কারণ, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো চাচ্ছিল না যে, ১০ শতাংশ রিবেট দেওয়া হোক। বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলোর মতে, এরাতো সেই কাবুলিওয়ালার চেয়ে আরো বেশি খারাপ। এরা শুধু সুদের ওপর সুদ নিতেই অভ্যস্ত। এরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাকেই থোড়াই কেয়ার করে। এসব ব্যাংক খুঁজতে থাকে নানা ফাঁকফোকর। দেখাগুলো, কিস্তি প্রদানের শেষ দিন সাপ্তাহিক বা সরকারি ছুটি হওয়ায় পরবর্তী কার্যদিবসে টাকা জমা হয়েছে। টাকা নিয়মিত জমা দিলেও কোনো কোনো ব্যাংক তা নির্ধারিত দিনের বাইরে জমা দেখিয়েছে। বছরে একবারও যদি এটি করা হয়, তাহলেই গ্রাহক আর ভালো গ্রাহক থাকছে না। কাজেই ব্যাংকগুলোকে আর রিবেট সুবিধা দিতে হবে না। অথচ নিজেরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক সূত্রই বলে থাকেন। এ অবস্থায় ১৮ জুন ২০২০ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক আরেকটি নির্দেশনা দিয়ে ঐ রিবেট সুবিধা বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে ভালো গ্রাহক চিহ্নিত করার কিছু পরামর্শও দিয়ে দেয়। তাতে দেখা যায়, ব্যাংকগুলো ভালো গ্রাহকদের ঠিকই চিহ্নিত করবে কিন্তু রিবেট দিতে হবে না। বিপরীতে শুধুমাত্র ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে, কিংবা কোনো বুকলেট, প্রচারপত্রে ঐ গ্রাহকের ছবি ছাপিয়ে দিলেই চলবে। তবে কোনো গ্রাহক ভালো ঋণ গ্রহীতা হিসেবে বিবেচিত হলে তিনি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত রিবেট প্রাপ্য হবেন। এরপর আর এ সুবিধা পাওয়া যাবে না।
এ নির্দেশনার বিরোধিতা করে খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই কোনো কোনো সূত্র বলেছে, এটা এক ধরনের নৈরাজ্য। বড়ো খেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া হলো। তবে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে যারা ঋণখেলাপি হয়েছেন তাদের বিষয়টি দীর্ঘদিন ছিল উপেক্ষিত। এই করোনাকালেও প্রণোদনা দেওয়া হলো বড়ো ব্যবসায়ীদের। যে ধরনের ঋণসুবিধা প্রণোদনায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো, তা শুধু বড়োরাই পাবে। ছোটোদের কোনো স্থান হবে না তাতে। এধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাবে বৈ কমবে না। অনেক ভালো গ্রাহকই ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে উত্সাহিত হবেন না। তারা ব্যাংক খাতে বড়ো ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়ে বলেন, ব্যাংক খাত ঠিক না হলে অর্থনীতিকে বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আবু ফারাহ মো. নাছের বলেন, আগে ঋণের সুদ হার বেশি ছিল, প্রায় ১৫ শতাংশ। তাই রিবেট সুবিধা দিয়ে ঋণগ্রহীতাদের সুদ একটু কমানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ১ এপ্রিল থেকে সব ঋণের সুদ কমিয়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এজন্য রিবেট সুবিধা আর না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে রিবেট সুবিধা না দেওয়া হলেও আগের ভালো ঋণগ্রহীতার খেতাব ও সম্মাননা তারা পাবেন। এছাড়া ভবিষ্যতে যে কোনো সুবিধাও ভালো ঋণগ্রহীতাদের দেওয়া হবে। এজন্য ভালো ঋণগ্রহীতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হার বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক রিবেট সুবিধা বাতিলের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছে। কিন্তু এই করোনাকালেও ব্যাংকগুলো চাপ দিচ্ছে কিস্তি প্রদানের। না দিলে জরিমানা দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারিও দিচ্ছে। তাহলে সুদের হার কি সিঙ্গেল ডিজিটে থাকবে? ব্যাংকের নানা লুক্কায়িত চার্জ, জরিমানা ইত্যাদি হিসাব করলে কার্যত সুদের হার এখনো সিঙ্গেল ডিজিটে নামেনি বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সরল সুদ বাস্তবায়ন দ্রুতকরণ এবং যারা নিয়মিত কিস্তি দেবেন, তাদেরকে বছরে এক কিস্তির অর্থ মওকুফ করার বিধান করা যেতে পারে। ব্যাংক ঋণের সুদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিন্ন হার এবং আলাদা খাতভিত্তিক সুদ হার নির্ধারণ না করে সমহারে সিঙ্গেল ডিজিটে সরল সুদ ব্যবস্থা চালু করলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। উদ্যোক্তা অর্থনীতির বিকাশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ঋণ জালিয়াতির জন্য যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা দায়ী তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
সূত্রমতে, ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যোগসাজশ করে ঋণ প্রদানের কারণেই ব্যাংকিং খাতের এই দশা হয়েছে। যদিও গুটিকয় মধ্যসারির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই শুধু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিচালক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বরাবরই রয়ে যাচ্ছেন জবাবদিহিতার বাইরে। অথচ তারাও দায় এড়াতে পারেন না।