এই সামর্থ্য লইয়া করোনার বিরুদ্ধে কী করিয়া লড়িব?

এক টুইটবার্তায় গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ তাত্পর্যপূর্ণ মন্তব্য করিয়াছেন। বার্তাটি এইরূপ ছিল, ‘অন্য দেশের চাইতে যুক্তরাষ্ট্রে করোনার টেস্টিং ব্যাপক আকারে এবং উন্নত পদ্ধতিতে হইতেছে বিধায় তাহার দেশটিতে অনেক বেশি সংক্রমণ দেখা যাইতেছে। টেস্টিং না হইলে বা দুর্বল পদ্ধতিতে টেস্টিং হইলে দেখা যাইত, এই দেশে (আমেরিকায়) করোনা-সংক্রমিত কোনো রোগীই নাই!’ অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের এই টুইটবার্তার অংশবিশেষ লইয়া তাহাকে হাসির পাত্র বানানো হয়। এইভাবে বলা হইয়াছে যে, ট্রাম্প বলিয়াছেন—‘করোনা ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা বেশি হইতেছে বলিয়াই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে সংক্রমণ বাড়িয়া যাইতেছে। টেস্ট বন্ধ করিয়া দিলে এমনিতেই সংক্রমণ কমিয়া যাইবে।’

প্রকৃতপক্ষে ট্রাম্পের ঐ টুইটবার্তার মধ্যে গভীর একটি সত্য মূর্ত হইয়াছে। তাহার সারবত্তা হইল—নো টেস্ট, নো করোনা। অর্থাত্ করোনা টেস্ট খুব সামান্য করাইলে রোগীও অল্প মিলিবে। আবার দুর্বল পদ্ধতিতে করাইলেও রোগী পাওয়া যাইবে কম। বাংলাদেশ যেন এই ক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ হইয়া উঠিয়াছে। জাতীয় কল সেন্টার ও আইইডিসিআরের নির্ধারিত হটলাইনে ১৪ জুন পর্যন্ত করোনা টেস্ট করিবার লক্ষ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ ফোন কল আসিলেও পরীক্ষা হইয়াছে মাত্র ৫ লক্ষ। অর্থাত্ মোট টেস্ট করিবার চাহিদার তুলনায় টেস্ট করা হইয়াছে মাত্র ৫ শতাংশেরও কম। ইহার পাশাপাশি উদ্বেগের কথা হইল, করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ ও প্রতিবেদন প্রদান করিতে কখনো কখনো আট হইতে ১০ দিন এমনকি ১৫ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হইতেছে। অসংখ্য ক্ষেত্রে রোগী মারা যাইবার পর কিংবা সুস্থ হইবার পর জানা যাইতেছে তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। অন্যদিকে করোনা পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হাসপাতালগুলির ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশেই দক্ষ জনবলের ঘাটতি লক্ষ করা গিয়াছে। সরকারের করোনাবিষয়ক ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটির এক সদস্য বলিয়াছেন—দেশের ৬০টি ল্যাবের অধিকাংশই দুই-এক জন টেকনোলজিস্ট লইয়া চলিতেছে। আরেকটি বিষয় হইল, করোনা শনাক্তের পরীক্ষার জন্য নাক ও গলার লালার নমুনা সংগ্রহ করিতে হয় বিশেষ কাঠির (সোয়াব স্টিক) মাধ্যমে। এই নমুনা বিশেষ তাপমাত্রায় পাত্রে রাখিয়া তাহা ল্যাবরেটরিতে পাঠাইতে হয়। নমুনা সংগ্রহের জন্যও দরকার হয় বিশেষ প্রশিক্ষণের। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্তসংখ্যক টেকনোলজিস্ট নাই। দুঃখের ব্যাপার হইল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১০ বত্সরে টেকনোলজিস্ট নিয়োগ বন্ধ রহিয়াছে।

এখন করোনার উপসর্গ লইয়া হাসপাতালের দুয়ারে যেইভাবে অসহায় মানুষ ঘুরিতেছে, যেইভাবে হটলাইন নম্বরে বাড়িতেছে উপসর্গ থাকা রোগীদের ফোন কল—তাহাতে ভবিষ্যতে করোনার সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে লাফাইয়া লাফাইয়া বাড়িতেই থাকিবে। আমরা বেশ দ্রুততার সহিত লক্ষের ঘরে পা রাখিয়াছি। ইহা সরকারি হিসাব মাত্র। কিন্তু ঐ ১ কোটি ১০ লক্ষ ফোন কলের সবাইকে করোনা টেস্ট করাইলে আমরা ইউরোপের অধিকাংশ দেশকে হারাইয়া দিতে পারিতাম বলিয়া মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। অন্ধ থাকিলে তো প্রলয় বন্ধ হইবে না। এখন প্রশ্ন হইল, এই সামর্থ্য লইয়া আমরা করোনার বিরুদ্ধে কী করিয়া লড়িব? সঠিক ব্যবস্থাপনার এখনই সময়।