বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শরণার্থীদের প্রতি মানুষের মধ্যে সহানুভূতি সৃষ্টি, সচেতনতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং পৃথিবীকে শান্তিময় করে গড়ে তুলতে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানায়। এখানে বলিষ্ঠভাবে উচ্চারিত হয় সেসব দেশের নাম যারা মানবতার জন্য শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে, নিজ ভূমিতে স্থান দিয়েছে। আলোচিত হয় বিশ্বে চলমান যুদ্ধ-সংঘাতের কথা এবং উচ্চারিত হয় যুদ্ধ-সংঘাতের খলনায়ক, দায়ী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর নাম, এমনকি ফুটে উঠে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর ব্যার্থতাও। এই দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে শরণার্থীদের বেদনার্ত জীবনে আশার সঞ্চার হয়, ধৈর্য, সাহস ও মনোবল বৃদ্ধি পায়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ২০২০ সালে প্রকাশিত বার্ষিক ‘গ্লোবাল ট্রেন্ডস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে ১৮৭টি দেশে সর্বমোট ০৭ কোটি ৯৫ লক্ষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষ (Forcibly Displaced People) রয়েছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১%, এবং এর প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বিশ্বব্যাপী এই বিপুল সংখ্যক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষ বা শরণার্থী নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করা এবং বছরের পর বছর সহায়তা প্রদান করা জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া যে সকল রাষ্ট্র এদের আশ্রয় দিয়েছে তারা দেশের জন্য বাড়তি চাপ জেনেও মানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছে। বিশ্বের সর্বমোট শরণার্থীর ৮৫ শতাংশকেই আশ্রয় দিয়েছে উন্নয়নশীল বা স্বল্প উন্নত দেশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক বড়ো উদাহরণ। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস, বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে অতিরিক্ত ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণাথীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের কাছে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ।
বিশ্বে গত বিশ বছরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক অগ্রগতি হয়েছে, বিশ্ব উন্নত হয়েছে; কিন্তু বিশ্ব শরণার্থী পরিস্থিতির অবনতি এবং এর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ থেকে স্পষ্টতঃ যে, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে যুদ্ধ-সংঘাত-হানাহানি হ্রাস পায় না। প্রকৃতপক্ষে এর দ্বারা শান্তির পথ সুগম হয় না, সবার মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ ও মানবতা জাগ্রত হয় না। বরং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আধুনিক সমরাস্ত্রের প্রসার ঘটে, দেশে দেশে যুদ্ধ-সংঘাতের নিত্য-নতুন রূপ লাভ করে, নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে। সর্বোপরি শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বার্থ, দুর্বল রাষ্ট্রসমূহের সরকারের স্বার্থ, কোনো রাষ্ট্রের মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি কারো লালসা, কারো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নজর, আবার কারো আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা অথবা বৃহত্ শক্তিগুলোর মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা; এসব কারণে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কূটকৌশলের খেলায় বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাত লেগেই থাকে। স্বার্থের কাছে যেখানে মানবতার পরাজয়, সেখানে গোটা বিশ্বকে শান্তির সোপানে তোলা সম্ভব নয়। তাই বিশ্বশান্তি যেন সুদূর পরাহত। কিন্তু তাই বলেতো থেমে থাকা যায় না। বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাত হ্রাস ও নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের হাতকে শক্তিশালী করে আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ ইউএনএইচসিআর-এর চলমান কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করতে হবে। তাহলে হয়তো বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাত কমে আসবে এবং শরণার্থীর সংখ্যাও হ্রাস পাবে।
n লেখক :উপ-মহাপরিচালক (বিডি-৭), সেনা কল্যাণ সংস্থা