সেই সুদিনের অপেক্ষায়

কোলাহল মুখর বিদ্যালয়ের পরিবেশ আবার কবে ফিরবে কেউ জানে না; সবচেয়ে অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও পরবর্তী ক্লাসের উত্তরণ নিয়ে। তারচেয়েও বড়ো শঙ্কা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। আমাদের সন্তানেরা যদিও বাসায় অভ্যস্ত হচ্ছে হাত ধুয়ে ফেলতে, পরিচ্ছন্নতার সকল নিয়ম শেখাচ্ছেন একালের সচেতন অভিভাবকেরা। কিন্তু শিশুরা বুঝবে না সামাজিক দূরত্ব, বন্ধুর সঙ্গে হাত মেলানোর নিষেধাজ্ঞা ভুলেই যাবে তারা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভুলে যাবে কোলাকুলির নিষেধাজ্ঞা। এমন ঝুঁকির মুখে শিশুদের ফেলে দেওয়া একরকম বোকামি। আর সে কারণেই বন্ধ রাখা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এখন, করোনা পরিস্থিতি বাদ দিলেও আমাদের এই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা আদৌ কতটা স্বাস্থ্যসম্মত সে প্রশ্ন  থেকেই যায়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একাধিক স্তরের। কিছু ক্ষেত্রে নীতিমালা না মেনে প্রতিষ্ঠান চালানো, দুর্নীতি ও অব্যবস্থা দারুণভাবে ব্যাহত করছে আমাদের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। আমরা জানি, ইংরেজি ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা অবস্থান করছে দুই ভিন্ন মেরুতে—একটি দেশীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করতে ব্যর্থ অনেকটাই, অন্যটির আধুনিকায়ন আজ সময়ের দাবি।

এখন আসুন ভাবা যাক এই শিক্ষকদের নিয়ে। বিদ্যালয় বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম যাঁরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সংসারের প্রতিদিনের সংকট কিন্তু এই করোনাকালেই প্রকট হচ্ছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত নিরীক্ষণ, প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। একটি বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সারা বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চড়া হারে টিউশন ফি আদায় করা ছাড়াও নানান সুযোগ-সুবিধার খতিয়ান দেখিয়ে অর্থ আদায় অব্যাহত রেখেছিল কিছুদিন আগেও। প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত এত টাকা এবং শিক্ষকদের মাসোহারা থেকেও এমনকি একটা নির্দিষ্ট হারে  শিক্ষক কল্যাণ তহবিলের জন্য কেটে নেওয়া অর্থ আজ কোথায়? মনে রাখতে হবে, যে পরিবারে শুধু পুরুষ সদস্যটি শিক্ষক হিসেবে একটি বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত, তাঁর পুরো পরিবার নির্ভর করে থাকে তাঁর উপার্জনের ওপর। খুব ছোটো পরিবারও যদি ধরা হয়, তাহলেও, কমপক্ষে চার সদস্যের একটি পরিবার চালাতে, স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। এমনি পরিস্থিতিতে যদি তাঁর বেতন মাসোহারা বন্ধ থাকে, তাহলে তাঁর অবস্থাটা সহজেই অনুমেয়। বাস্তব সত্য হচ্ছে, অর্থহীন, নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে কাটানো এইসব মানুষকে সরাসরি সাহায্য পাঠানোও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ একজন অভাবী মানুষকে সাহায্য করা যতটা সহজ, একজন শিক্ষককে সাহায্য করা ততটা নয়; কারণ তিনি কর্মজীবী, তিনি শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। স্বাভাবিকভাবেই, অন্যের কাছে হাত পেতে নেওয়া তাঁর জন্য সুখকর নয়।

আর তাই, শিক্ষকদের সম্মিলিতভাবে সাহায্য করতে শুধু সরকারি উদ্যোগের প্রতি দৃষ্টি দিলে হবে না, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে, সমাজের বিত্তবানদের সহায়তাও দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার নিয়মতান্ত্রিকতা, স্বচ্ছতা। আর, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। সেই সুদিনের অপেক্ষায়।

ঢাকা