চলছে আষাঢ় মাস। পুরো বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর পাহাড়ে বা পাহাড়ের কোলঘেঁষে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। বর্ষা মৌসুম আসে আর পাহাড়ধস নিয়ে আলোচনা হয়। সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও প্রতিবছর পাহাড়ধসে ঘটে জানমালের ক্ষতি। এর অন্যতম কারণ, পাহাড়কে পাহাড়ের মতো করে থাকতে না দেওয়া। পাহাড় কেটে পাহাড়ের পাদদেশে গরিব গৃহহীন মানুষের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে বেশ কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী পাহাড়ের স্থায়ী ক্ষতি করে চলেছে। পাহাড় কেটে পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে পাহাড়ধসকে স্বাগত জানানো হচ্ছে। পাহাড়খেকো প্রভাবশালীদের সম্পর্কে নিশ্চয় প্রশাসন অবগত! পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা নিম্নআয়ের মানুষদের মধ্যে অল্প বৃষ্টিতে ভয় কাজ করে আর টানা বৃষ্টি হলে রীতিমতো মহাআতঙ্ক শুরু হয়ে যায়। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রামে ২৮টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসতি বয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা অনেক সময় কাজে আসে না। অনেক সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোর গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যাতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু সেসব সিদ্ধান্ত ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হয় না। করোনাকালে সবাই নিজ ঘরে অবস্থান করছে; ফলে এখন যদি কোনো কারণে পাহাড়ধস হয় তাহলে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।
পাহাড় কাটা ও বন উজাড় করার ফলে বর্ষা মৌসুমে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অপরূপ সৌন্দর্যের অন্যতম উপাদান হচ্ছে পাহাড়। পাহাড়ের সঙ্গে রয়েছে এ শহর ও অঞ্চলের আত্মিক বন্ধন। পাহাড় ধ্বংস করা হলে এ শহরের ভৌগোলিক চরিত্রও বদলে যেতে পারে। কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্রের লোভ ও লালসা পাহাড়ের এই সৌন্দর্য নষ্ট করছে। দিনে ও রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্রের পাহাড়কাটা থেমে নেই!
সহজকথায় পাহাড়কাটা বন্ধ করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে সব ধরনের বসতি উচ্ছেদ করতে হবে। ২০০৭ সালে পাহাড়ধসে প্রাণহানির পর গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে পাহাড়ধস বন্ধে কিছু সুপারিশ করেছিলেন। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে আজ পাহাড়ধস নিয়ে এত চিন্তিত হতে হতো না। পাহাড়ধসের স্থায়ী সমাধানের দিকে নজর দিতে হবে। পাহাড়ে অপরিকল্পিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি তৈরি, বন উজাড়, যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মাণ, পাহাড় কাটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, পাহাড়ধস বন্ধে পুরো পাহাড়ের চারপাশে পাথর ও সিমেন্টের ব্লক তৈরি করা হয়। পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের জন্য রাখা হয় পৃথক ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও এখন এ প্রযুক্তিতে পাহাড় রক্ষার কৌশল কাজে লাগানো যেতে পারে।
পাহাড়গুলো আমাদের সম্পদ, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যায় না! ধারাবাহিকভাবে পাহাড়ের ক্ষতি করে চললে পাহাড়ও একসময় তার প্রতিশোধ নেবে। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়কে নিজেদের স্বার্থে কোনো গোষ্ঠী বা চক্র যেন ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশের সার্বিক ভারসাম্য রক্ষা ও পর্যটনের বিকাশে পাহাড় রক্ষার বিকল্প নেই।
ঢাকা