৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধের ঝুঁকিতে

কোভিড-১৯ ভাইরাস প্রতিরোধে গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো দেশের ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। জুন থেকে সীমিত পরিসরে জরুরি পরিষেবা কার্যক্রম, অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের নানা প্রতিবন্ধকতা ও নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে তাদের এতদিনের শ্রমে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো বন্ধ হয়ে যাবার পথে। গ্রামীণ নারী উদ্যোগের এই ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হলে নারীর সামগ্রিক অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট (স্টেপস্) এবং জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যালায়েন্স (গ্যাড অ্যালায়েন্স)-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে—এই করোনাকালে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবসা বন্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে। বাকি ২০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা কোনোমতে তাদের ব্যবসার চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছেন। ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এই করোনার সময়ে তাদের ব্যবসা চালাতে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে পারেননি। ফলে তাদের উত্পাদনের ধারাবাহিকতা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।

অন্যদিকে ৪৬ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, এসময়ে যানবাহন বন্ধ থাকার কারণে অনেক কষ্টে চড়ামূল্যে বাজার থেকে কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে পেরেছেন। একারণে বর্ধিত খরচে এসময়ে সীমিত আকারে উত্পাদন করলেও পণ্যের বেশি দামের কারণে ক্রেতাদের নিকট তারা পণ্য বিক্রয় করতে পারেননি। ফলে তাদের অবিক্রিত পণ্য পড়ে আছে, যা আগামীতে বিক্রি হওয়া নিয়েও তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন। এসব কারণে চারদিক থেকে নারী উদ্যোক্তারা পড়েছেন চাপের মুখে। স্টেপস্ এবং গ্যাড অ্যালায়েন্স-এর যৌথ উদ্যোগে দেশের ১০ জেলায় সম্প্রতি ৪০০ জন ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে সাক্ষাত্কার গ্রহণের মাধ্যমে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সাক্ষাত্কারে নারী উদ্যোক্তারা বলেছেন, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আয় না থাকার কারণে নারী উদ্যোক্তাদের ওপর পুরো সংসারের দায় এসে পড়েছে। অন্যদিকে করোনার সময়ে স্থানীয় পর্যায়ের মার্কেট বন্ধ থাকাসহ মানুষের সীমিত চলাচলের কারণে উত্পাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় তাদের সংকটে পড়তে হয়েছে। গত বাংলা নববর্ষ এবং ঈদের সময় ক্রেতা না থাকায় তারা তাদের উত্পাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেনি, অথচ বছরের এই দুটি উত্সবই সাধারণত তাদের ব্যবসার মূল সময়। ফলে একদিকে কমেছে তাদের নিজেদের আয়, অন্যদিকে তাদের উত্পাদন সহযোগী গ্রামীণ অসহায় নারীদের মজুরি প্রদানেও ব্যর্থ হয়েছেন তারা। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তাদের এতদিনের শ্রমে অর্জিত ছোটো ছোটো উদ্যোগ এবং ব্যবসা। ঘাড়ে চেপে বসেছে ঋণের বোঝা। সামাজিক কর্মকাণ্ডে কমেছে তাদের অংশগ্রহণ। অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তাদের পরিবারের শিশুদের শিক্ষাজীবনে।

দীর্ঘ সময়ে বাজারে না থাকার কারণে তাদের জায়গা বেদখল হয়ে যাবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ব্যবসার পুঁজি হারানোর ফলে তাদের আগামী দিনের চলার পথ আরো সংকটময় হবে বলে মনে করছেন তারা। সবমিলিয়ে পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে নারীদের যে অর্থনৈতিক অবদান ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে তা কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাদের সহযোগী গ্রামীণ নারীরাও ইতিমধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের আয়ের উত্সও বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের পরিবারও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট (স্টেপস্) এর নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার বলেন, প্রণোদনার অংশ হিসেবে দেশে গ্রামীণ ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের সরকারিভাবে সহজ শর্তে ও বিনা সুদে ঋণ প্রদান করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যে ঋণ তারা গ্রহণ করেছিলেন তার সুদ মওকুফ অর্থাত্ চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১০ মাসের ঋণের সুদ মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।