করোনার মহামারিতেও থেমে নেই চাঁদাবাজি

সারাদেশে করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁদাবাজরা সক্রিয়। এরই মধ্যে রাজধানীর বাড্ডা, খিলগাঁও, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকায় চাঁদা দাবি করার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অর্ধশতাধিক মামলা হয়েছে। পুলিশ শতাধিক চিহ্নিত চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করেছে।

অবশ্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তুলনায় চাঁদাবাজির ঘটনা এখন নেই বললেই চলে। যে দু-একটি ঘটনা বা অভিযোগ আসছে, তা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ডিএমপির গণমাধ্যম ও পাবলিক রিলেশন্স শাখার উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন তো বিষয়টি স্বীকারই করলেন না। তিনি এই প্রতিনিধির কাছে দাবি করেন, এখন পর্যন্ত ডিএমপিতে চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কেউ যদি অভিযোগ করেন, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা ত্বরিত ব্যবস্থা নিচ্ছে।

করোনা প্রতিরোধে গত ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণার পূর্বে রাজধানীতে আলোচনার বিষয় ছিল ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক       খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ক্যাসিনোতে চাঁদাবাজি এবং গণপূর্তের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একক আধিপত্য বিস্তার। একই অভিযোগে গ্রেফতার হন যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীম, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, এনামুল হক এনু, রূপন ভূঁইয়া ও শফিকুল আলম ফিরোজ। এদের গ্রেফতারের রেশ ধরে ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হন যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া।

এদিকে করোনা প্রতিরোধে সাধারণ ছুটি চলার সময় খিলগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ক্যাবল ব্যবসায়ী শাহজালালের কাছে ক্যাসিনোর গডফাদার খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ডান হাত বলে পরিচিত শাহাদত হোসেন সাধু চাঁদা দাবি করেন। শাহজালালের কাছে বেশ কয়েকবার ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শাহজালাল গত ১১ মে খিলগাঁও থানায় সাধু, রকি, রিয়াদ ও সোহেল ব্যাপারী এবং অজ্ঞাত তিন-চার জনকে আসামি করে একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন। এ মামলায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে রকি ও সোহেলকে গ্রেফতার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য গোপীবাগের অঙ্কুরের নাম পাওয়া যায়। পরে সবুজবাগ থানা পুলিশ গত ৮ জুন অঙ্কুরকেও গ্রেফতার করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার এসআই ইলিয়াস হোসেন বলেন,  গ্রেফতারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঁদাবাজির ঘটনার সত্যতা মিলেছে। তবে এ গ্রুপের গডফাদার সাধু এখনো পলাতক। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানা এলাকার শীর্ষ চাঁদাবাজ হাবিবুর রহমান ওরফে টাইগার হাবিবকে গত ১৫ জুন আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার করে সিআইডি পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পুরান ঢাকার ইসলামপুর এলাকায় কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে টাইগার হাবিবের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় চাঁদাবাজি ও হত্যার অভিযোগে ১৫টি মামলা রয়েছে। ২০০৬ সালে কেরানীগঞ্জে চাঁদাবাজি করার সময় পুলিশের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন টাইগার হাবিব। তার বড়ো ভাই বুদ্দা পিচ্চি ও ছোটো ভাই মোহাম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধেও পুরান ঢাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁদাবাজির থাবা পড়েছে। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে পরিবহন ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। পুলিশের খাতায় কালাম, মোহাম্মদ আলী, জালাল, দেলোয়ার, মশফিকুল, জাহাঙ্গীর, হান্নান, মুকুল, রেজাউল, বাচ্চু, মোস্তফা, সেলিমসহ অর্ধশত চাঁদাবাজের নাম রয়েছে। এরা বিভিন্ন পরিবহন ও শ্রমিকসংগঠনের নামে চাঁদাবাজি করেন। মহাখালী বাস টার্মিনাল ও গাবতলী বাস টার্মিনালের পরিবহন ব্যবসায়ীরাও এই চাঁদাবাজির শিকার। বিষয়টি নিয়ে পরিবহন ব্যবসায়ীরা পুলিশের আইজির কাছে অভিযোগও করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ গত ১ জুন থেকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের নামে। গত ১৭ জুন পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১০৯ জন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনায় ৫১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে।