প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে উল্লেখ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। করোনার অতিমারির সময়কালে ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, রপ্তানি ১৫ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যসহ রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। করোনার অতিমারির প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতিতেও দুর্বলতা রয়েছে। গতকাল শনিবার ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সিপিডি আয়োজিত ভার্চুয়াল সংলাপে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। মূল উপস্থাপনায় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সারাবিশ্বই মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা কতদিন চলবে কেউ এখনো জানে না। এ পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ দ্বিগুণ বাড়ানো এবং রপ্তানি ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। বর্তমান অবস্থায় ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও দুর্বল। এই পরিস্থিতিতে বাজেট কয়েক মাস পর পর পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, দেশে এখন চমত্কার রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিরাজ করছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রিজার্ভ ভালো অবস্থানে রয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড়ো পরিবর্তন এসেছে। কোভিড-১৯ সঙ্গে নিয়েই আমরা কাজ করে যাব। সেভাবেই সম্প্রসারণমুখী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে আগামীতে আমরা কৃষিতে আরো গুরুত্ব দেব। প্রবৃদ্ধি নিয়ে আমরা কোনো ম্যানিয়ায় ভুগছি না। বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ সবার মতামত গুরুত্বের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে। গত ১০ বছর ধরে আমরা সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়িয়েছি, উন্নয়ন করেছি। এবারের বাজেটও বাস্তবায়ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, এটা কোনো স্বাভাবিক সময় নয়। এখন জীবন-মরণ ইস্যু। সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ ব্যবহার পর্যবেক্ষণে টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজেট বাস্তবায়ন কতটুকু হচ্ছে সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়, প্রণোদনার অর্থ ব্যয়, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য প্রতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি গোষ্ঠীকে সহায়তা করতে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছে, বাজেট দিয়েছে। ১ লাখ কোটি টাকা প্রণোদনার ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের ঋণ। সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার ক্যাসিনোতে পরিণত হয়েছে। মূলত দলীয়করণের মাধ্যমে কিছু লোক শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটে আর্থিক খাত সংস্কারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা উচিত ছিল। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে বা আর্থিক খাতের বিষয়। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, আমরা সংস্কার করেছি। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ করে দিয়েছেন। এটা সংস্কার নয়, এটা আরো পিছনে ঠেলে দেওয়া। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ে কিছু সংস্কার করবেন বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বলা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে আসবে, এটা তো রুটিন কথা। সবসময় বলে থাকেন। উলটো তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যে ট্যাক্সের ব্যবধান কমে যাচ্ছে। আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টাকা ছাপিয়ে উন্নয়ন ব্যয় করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারলে টাকা ছাপিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন দিতে হতে পারে।
মেট্রোপলিট্যান চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ সত্ ব্যবসায়ীরা নিরুত্সাহিত হবে। তাছাড়া সম্প্রতি ভালো ঋণ গ্রহীতাদের ১০ শতাংশ রিবেট দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভালো ব্যবসায়ী হওয়া ভালো না।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট সাবের হোসেন চৌধুরী, এমপি, সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক, ঢাবি অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, বিল্ডের সিইও ফেরদৌস আরা বেগম, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট কামরান টি রহমান প্রমুখ।