মৃত্যু এক অলঙ্ঘনীয় নিয়তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘মৃত্যু’ কবিতায় বলিয়াছেন :‘অসীমের অসংখ্য যা-কিছু/ সত্তায় সত্তায় গাঁথা/ প্রসারিত অতীতে ও অনাগতে।/ নিবিড় সে সমস্তের মাঝে/ অকস্মাত্ আমি নেই।’ তিনি বলিয়াছেন, ‘মরণের ছবি মনে আনি। ভেবে দেখি শেষ দিন ঠেকেছে শেষের শীর্ণক্ষণে।’ গতকাল শনিবার আমাদের মধ্য হইতে চিরবিদায় লইয়াছেন কামাল লোহানী! আর মাত্র পাঁচ দিন পর ছিল তাহার ৮৭তম জন্মদিন। তিনি অসুস্থই ছিলেন বেশ কিছুদিন ধরিয়া; কিন্তু করোনায় সংক্রমিত হইয়া সময়ের আগেই বিদায় লইলেন আমাদের ভুবন হইতে।
কামাল লোহানী এক চিরবিদ্রোহীর নাম। কত কিছুই না ঘটিয়াছে তাহার জীবনে। আমাদের পরম প্রাপ্তি ঘটিয়াছিল একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে। আর বিজয়ের সেই খবর আসিয়াছিল যাহার কণ্ঠ হইতে, তিনি কামাল লোহানী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগের প্রধান ছিলেন কামাল লোহানী। তিনি বেতার হইতে ইস্পাতদৃঢ় বজ্রকণ্ঠে সংক্ষেপে বলিয়াছিলেন, ‘আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।’ অতঃপর সারাদেশ মাতিয়া উঠিয়াছিল বিজয় উত্সবে। পাকিস্তান আমলে বাঙালির উপর যেই শোষণ শুরু হইয়াছিল, সেই বঞ্চনার জবাব যাহারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীনভাবে দিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন কামাল লোহানী। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরিয়া প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সকল ক্ষেত্রে তাহার স্পষ্ট পদচিহ্ন দেখিতে পাওয়া যায়। তিনি মনে করিতেন, সংস্কৃতিহীনতা লইয়া বেশি দূর আগাইতে পারে না কোনো জাতি। তিনি বুঝাইতে চাহিতেন, নিজের শিকড় আগে আঁকড়াইয়া ধরো, তাহার পর বিশ্বমানব হও। ১৯৬১ সালে ছিল রবীন্দ্র শতবর্ষ। রবীন্দ্রনাথ তখন পাকিস্তান সরকারের নিকট ব্রাত্য; কিন্তু রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনে কামাল লোহানীরা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মাত্র ১৯ বত্সর বয়সে তাহাকে প্রথম রাজনৈতিক কারাবরণ করিতে হয়। ১৯৫৫ সালে তিনি তৃতীয় দফায় গ্রেফতার হইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের সহিত তাহাকে একই জেলকক্ষে বন্দিজীবন কাটাইতে হয়। সেই বন্দি দিনগুলিতে তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পান, উপলব্ধি করিতে পারেন জাতির জনকের অপার ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৮ সালে কামাল লোহানী নৃত্যশিল্পের সহিত সম্পৃক্ত হন। ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে পূর্ব বাংলার যেই সকল শিল্পী বিশেষ ভূমিকা রাখিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে কামাল লোহানীর ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। সাংবাদিক হিসাবে তিনি কাজ করিয়াছেন দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক বার্তায়। সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা হিসাবে সাংবাদিক সমাজের অধিকারের ব্যাপারেও তাহার ছিল তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। ছিলেন উদীচীর সভাপতি। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার খান সনতলা গ্রামে জন্ম নেওয়া আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী আজ আমাদের ছাড়িয়া চিরতরে চলিয়া গেলেও তাহার কর্মের শীতল ছায়ার আবেদন রহিয়া যাইবে সুদীর্ঘকাল। তাহার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করিতেছি।