দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বাংলাদেশে করোনা বা কোভিড-১৯-এর প্রকোপ বাড়ছে। দেশের মানুষের একটা অংশ বলছে, সরকার তাদের সীমিত শক্তি ও রিসোর্স নিয়ে সাধ্যমতো লড়ছে। আরেক অংশ (তারা দলে ছোটো) বলছে, সরকারের ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। তাতে অদক্ষতা ও দুর্নীতি জড়িত। মনে হয় দুই দলের কথাতেই সত্যতা আছে। তা আংশিক। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের অনেকেই স্বীকার করছেন, করোনা থেকে মানুষকে বাঁচাতে হাসিনা সরকারের তত্পরতা প্রশংসনীয়। এই তত্পরতার সঙ্গে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা যুক্ত না থাকলে শেখ হাসিনা আরো বেশি প্রশংসিত হতেন। দেশের মানুষের অন্য যে সংখ্যাল্প অংশটি করোনা দমনে সরকারি ব্যবস্থাপনাকে ত্রুটিপূর্ণ বলছেন, তাদের বক্তব্যও আংশিক সত্য এ কারণে যে করোনা দমনে শেখ হাসিনার নির্দেশনা যতটা এফিসিয়েন্সির সঙ্গে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না তার আমলা প্রশাসনের একটা বড়ো অংশের দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে। নইলে সীমিত রিসোর্স ও সীমিত দক্ষ জনশক্তি নিয়ে করোনা দমনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল মোটামুটি ত্রুটিহীন।
আরেকটি (আরো মুষ্টিমেয়) দল করোনা দমনে সরকারি ব্যবস্থাপনাকে ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক বলে দাবি করে ‘অর্থনীতির চালিকাশক্তি’ ও ‘নাগরিক সমাজের উদ্বেগের’ নামে তাদের হয়ে নানা দাবি তুলে ধরছে, তারা হলো একটি ‘নিরপেক্ষ দৈনিকের’ নিরপেক্ষ কলামিস্টের দল। এখন প্রয়োজন করোনা থেকে মানুষকে বাঁচাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে ফাঁকফোকর বা ত্রুটি আছে, সেগুলো দর্শিয়ে সরকারের প্রচেষ্টা আরো জোরদার করার জন্য সুপরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া। জাতির আপত্কালে যেকোনো দেশের সরকারকেই সব বিরোধী মহলই বিরোধিতা বন্ধ করে সহযোগিতা দেয়।
আর আমাদের দেশে একটি ‘নিরপেক্ষ মিডিয়া’ নিরপেক্ষতার আড়ালে সরকারকে খোঁচা দিচ্ছেন, করোনা প্রতিরোধে সরকারের কথিত ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও বৈষম্যনীতির। জনগণের দুর্দশা মোচনের নামে তারা এমন সব দাবি-দাওয়া তুলছেন, যার সঙ্গে করোনা সম্পর্কিত আশু সমস্যাগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। আর প্রত্যক্ষভাবে করোনার প্রকোপ দূর করার জন্য তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, কোনো উন্নত দেশই তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ধরুন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের কথা। হিটলারকে দমনের ব্যাপারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন ব্যর্থ হওয়ায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করে চার্চিলকে সেই পদে বসানো হয়। তার কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় বামপন্থিরাও যোগ দিয়েছিল।
চার্চিলকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসিয়েই কেউ আশা করেনি তিনি রাতারাতি হিটলারকে ঠেকাতে পারবেন। ব্রিটেনের কাছে পর্যাপ্ত যুদ্ধাস্ত্র ও টাকা ছিল না। তাকে আমেরিকার কাছ থেকে কাবুলিওয়ালার সুদের হারে টাকা ধার করতে হয়েছে। ব্রিটেনের মানুষের রুটি, চিনি, দুধ, বাটার—সবকিছু রেশন করতে হয়েছে। দিনের পর দিন কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন করতে হয়েছে। হিটলারের বোমায় মানুষ মরেছে শয়ে শয়ে। দীর্ঘ সাত বছর ব্রিটেনের মানুষকে চরম দুর্দশার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। তারপর চার্চিলের চেষ্টা সফল হয়েছে। হিটলার পরাভূত হয়েছেন। এই সাত বছর ব্রিটেনের কোনো মিডিয়া দাবি করেনি, চার্চিল এই সাত বছরে ব্রিটেনের প্রত্যেক মানুষকে একটা করে চকোলেট খাওয়াতে পারেননি। সুতরাং তিনি ব্যর্থ।
শেখ হাসিনাকেও সময় দিতে হবে, সহযোগিতা দিতে হবে, তাহলেই তিনি পারবেন। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি দেশকে ভালোবাসেন। দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। অতীতে কি তিনি ঝড়, বন্যা, প্লাবন, সন্ত্রাসের মতো বড়ো বড়ো দুর্যোগ সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে দেখাননি, তিনি সমস্যা ও সংকটে লৌহমানবী হতে পারেন? সংকট মোকাবিলায় সফল হতে পারেন? এবারের সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের। ইউরোপের উন্নত দেশগুলো যেখানে করোনা সমস্যায় এখনো হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে হাসিনা সরকার সীমাবদ্ধ রিসোর্স, তুলনামূলক অদক্ষ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যা করছে, তা খুব খারাপ নয়। এই ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আছে, দুর্নীতি আছে। তবু সব ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যে বড়ো ভরসা তো শেখ হাসিনা। এটুকু বিশ্বাস করা যায়। অতীতের যেকোনো সরকারের চাইতে হাসিনা সরকারই বর্তমান দুর্যোগ মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য সরকার।
অতীতে ঝড়-বন্যা মোকাবিলায় বিএনপি সরকারের ‘অনেক কৃতিত্ব’ আমরা দেখেছি। সন্ত্রাস দমনের পরিবর্তে সন্ত্রাসীদের তারা আশ্রয়দাতা হয়েছিল। তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই বড়ো বড়ো উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্ম। খালেদা জিয়া প্রথমবার যেদিন প্রধানমন্ত্রী হন, সেদিনই প্রচণ্ড ঝড়-তুফানে বাংলাদেশ লন্ডভন্ড হয়েছিল। সেজন্য দেশের মানুষ তাকে নাম দিয়েছিল তুফানী বেগম। পরবর্তীকালে একই সঙ্গে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হয় এবং বাংলাদেশে খালেদা সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। বঙ্গোপসাগরে তখন আমেরিকার একদল মেরিন সৈন্য অবস্থান করছিল। তারা খালেদা সরকারের অনুমতি না নিয়েই (যা দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের তুল্য) বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে এবং ত্রাণকার্য চালায়। তার পরও বিরাট মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো যায়নি।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালে এক রাতের ঝড়েই মারা গিয়েছিল ১০ লাখ মানুষ। যথাসময়ে কোনো সরকারি সাহায্য আসেনি। পাকিস্তানের মন্ত্রীরা বলেছিলেন, ‘এটা ন্যাচারাল ক্যাটাসস্ট্রপি—অর্থাত্, পূর্ব পাকিস্তান প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। আমরা কী করব?’ একই কথা শোনা গেছে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার কণ্ঠে। নিউ ইয়র্ক সফরে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমরা প্রকৃতির হামলা কী করে ঠেকাব?’ আরো বলেছিলেন, ‘জাহানারা ইমাম কে, তা তিনি জানেন না।’ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শেখ হাসিনা এ কথা একবারও বলেননি। বাংলাদেশে যে মহাপ্লাবনে বিবিসি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, ২ লাখ মানুষ খাদ্যাভাবে ও জলডুবিতে মারা যাবে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ করে তিনি একজন মানুষকেও খাদ্যাভাবে মরতে দেননি।
শেখ হাসিনার জন্য বড়ো সংকট এসেছিল বিএনপি, জামায়াত ও তথাকথিত ইসলামি জিহাদিস্টদের মিলিত সন্ত্রাসের সময়। দুই বছরের বেশি এই সন্ত্রাস চলেছে। পেট্রোল বোমায় অসংখ্য নিরীহ নরনারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, বাংলাদেশে এই সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। ইউরোপে জিহাদিস্টদের সন্ত্রাস দমনের আগে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটি থেকে এই সন্ত্রাস সমূলে উচ্ছেদ করেছেন।
বাংলায় একটা কথা আছে, ‘যার রান্না খাইনি, সে বড় রাঁধুনি’। বাংলাদেশে তথাকথিত সুশীল সমাজের শাসন আমরা দেখিনি। তাই তারা এমনভাবে দেখায়, তারা ক্ষমতায় থাকলে দেশে সুশাসনের সুবাতাস বইত। সুশীল সমাজের শাসন আমরা দেখিনি বটে, কিন্তু তাদের ‘আইকন’ ড. কামাল হোসেনের শাসন আমরা দেখেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি নির্বাচনে না জিতলেও মন্ত্রী হয়েছেন। (বঙ্গবন্ধু একটি আসন ছেড়ে দিয়ে সেই আসনে ড. কামাল হোসেনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতিয়েছিলেন)। তিনি আইনমন্ত্রী, তেল ও জ্বালানিমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় দফায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
তিনি আইনমন্ত্রী থাকাকালে দেখেছি দেশে আইনের শাসনের অবস্থা। দেশ জুড়ে ‘ম্যান শেরু মিয়াদের’ দুর্নীতি ছড়িয়েছিল। বিভ্রান্ত বাম সন্ত্রাসীদের দ্বারা ঢাকা শহরেও অরাজকতা, হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে শেষ পর্যন্ত স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট পাশ করে এদের দমন করতে হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তিনি পাকিস্তানের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজুর রহমানের সঙ্গে দিল্লিতে দৌড়ে গিয়ে ধরনা দিয়েও বাংলাদেশের কোনো পাওনা আদায় করতে পারেননি। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় একটি সমস্যারও সমাধান করতে পারেননি। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর যখন ভারতের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি করেন এবং ২৫ বছরের যুদ্ধ ও রক্তপাতের অবসান ঘটান, তিনি তখন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গলা মিলিয়ে সেই চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন।
পৃথিবীর ও মানব সভ্যতার ইতিহাসে করোনার মতো ভয়ংকর ও বিশ্বগ্রাসী সংকট আর কখনো আসেনি। বাংলাদেশও এই সংকটে ভুগছে। তবে একটাই সান্ত্বনা, উপযুক্ত নেতৃত্ব এই সময় বাংলাদেশে ক্ষমতায় রয়েছেন। ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে তারা সংকটের মোকাবিলা করছেন। শুধু নিজেদের নয়, বিশ্ব মানবতাকেও বাঁচাতে এই ধৈর্য ও সাহসের প্রয়োজন আছে।
[ লন্ডন, ২০ জুন, শনিবার, ২০২০ ]