ঘরবন্দি তারুণ্যের দক্ষতা বিকাশ

ইয়াছির আরাফাত

পরিশ্রম করতে করতে ক্লান্ত হওয়ার কথা সহস্রবার শুনেছি; কিন্তু বিশ্রাম করতে করতে ক্লান্ত হওয়ার কথা আগে কখনো শোনা হয়নি। করোনায় লকডাউনের কারণে অধিকাংশ মানুষেরই ঘরে বসে, শুয়ে, ঘুমিয়েই যেন দিনের বেশির ভাগ সময় কেটে যাচ্ছে। করোনা যেন জীবনের প্রাণচঞ্চলতাকে গ্রাস করে ফেলেছে। যে কারণে র্িশশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, বেকার-কর্মজীবী— সব শ্রেণির মানুষকেই দিনরাত চার দেওয়ালে আবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম; কিন্তু কতদিন আর এভাবে অলস সময় কাটানো যায়! আর তাইতো ঘরবন্দি মানুষ এখন ঘরে বসেই কিছু না কিছু করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজ, নানান পদের অভিনব রান্না থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখার চেষ্টা চলছে।  শেখার কোনো বয়স নেই, সীমা নেই। শিখতে কে না চায়? বরং সময় এবং সুযোগের অভাবে কত সুপ্ত বাসনা অপূর্ণ থেকে যেতে বাধ্য হয়। তবে সময় নেই কিংবা সুযোগ নেই একথা বলার অবকাশ ইদানীং অন্তত নেই। করোনা, সময় এবং সুযোগ দুইটি জিনিসেরই সমন্বয় সাধন করেছে। নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিতপূর্বক সময়কে সঠিক ব্যবহার করলে দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি। বিশেষ করে তরুণদের দক্ষতা অর্জনের জন্য এই সময়টা যেনো বিশেষ সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যা জীবন থেকে সুদীর্ঘ সময় অলসভাবে কেটে যাওয়ার আক্ষেপ ঘুচাতে পারে। আর তার জন্য যার যার ক্যারিয়ারের লক্ষ্য অনুযায়ী নিজের স্কিল বাড়াতে মনোনিবেশ করতে হবে। বেসিক যে কাজগুলো সবারই জানা দরকার যেমন মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি ভালোভাবে শিখে নেওয়া যেতে পারে। যারা ফ্রিল্যান্সিং করার কথা ভাবেন তারা গ্রাফিক্স, ওয়েব ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্টের কাজ শিখতে পারেন। অথবা পূর্বে কোনো কাজ শেখা থাকলে এখন হাত পাকিয়ে নিতে পারেন। কারো যদি প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি আগ্রহ থাকে তাহলে সময়ক্ষেপণ না করে শুরু করতে পারেন। কারণ প্রোগ্রামিংয়ে ভালো করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সময়। যত বেশি সময় দেওয়া হবে তত বেশি ভালো করার সুযোগ রয়েছে। মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে যারা কাজ করেন তারা এখন নতুন পরিকল্পনা করে ভিন্ন ভিন্ন কাজ শুরু করতে পারেন। যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ইংরেজিতে কথা বলতে শেখা প্রয়োজন। এই সময়টা কিন্তু ইংরেজি চর্চার জন্য বেশ উপযোগী হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর গবেষণা করে সময়টাকে কাজে লাগাতে পারেন। এছাড়া অনলাইনে শত শত কোর্স করার সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকে নিজের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স করার মাধ্যমেও দক্ষতা বাড়াতে পারেন। সর্বোপরি যারা কোনো কিছুই করছেন না তারা বই পড়তে পারেন। বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী ও আত্ম-উন্নয়নমূলক বই, সায়েন্স ফিকশন ইত্যাদি বই পড়ার মাধ্যমেও নিজেকে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। মূল কথা হলো—এই অলস সময়টাকে সঠিক ব্যবহার করে নিজের দক্ষতার জন্য কার্যকর সময়ে পরিণত করতে হবে। এখন প্রশ্ন হতে পারে—লকডাউনের সময় ঘর থেকেই বাহির হতে পারি না—কীভাবে শিখব? করোনার কারণে বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক গতি রোধ করা হলেও ভার্চুয়াল জগতে কিন্তু কোনো লক নাই। লক হওয়ার সম্ভাবনাও নাই কোনো দিন। ঘরে থাকলেও মুহূর্তের মধ্যেই সারা বিশ্ব পরিভ্রমণ করা যাচ্ছে দুই-চারটা ক্লিকের মাধ্যমে। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর কোনো কিছু শিখতে ঘর থেকে বের না হলেও চলে। অনলাইনের মাধ্যমে বাচ্চারা ঘরে বসে ক্লাস করবে—এটাও তো অনেকেই ভাবতে পারেনি। বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে ঘরে বসেই এমন কিছু নাই যা শেখা যায় না। যার প্রমাণ ওয়াসিক ফারহান রুপকথা নামক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকার সেই বালক দেখিয়েছে। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই সে গেম ডেভেলপমেন্ট, ভিডিও অ্যানিমেশন ও সফটওয়্যার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—সবকিছু সে নিজেই শিখেছে। সাহায্য নিয়েছে শুধু ইন্টারনেটের।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় আমাদের তরুণ প্রজন্মের বড়ো একটা অংশের সময় কাটছে ফেসবুক, ইউটিউবে বিনোদন কিংবা গেম খেলার মাধ্যমে। যা নিতান্তই সময়ের অপচয় ছাড়া ফলদায়ক কিছু দেয় না। এই অবস্থান থেকে সরে এসে করোনার সময়টাকে নিজের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা জরুরি। এক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। করোনার ক্রান্তিকাল শেষে যেনো আফসোস করতে না হয়, সময়কে যেনো হাতড়িয়ে ফিরতে না হয় সেদিকে সবারই নজরদারি করা প্রয়োজন।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা প্রকৌশল ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর