বাবা তোমাকে সব সময় খুব মনে পড়ে। সেই ছোটোবেলায় গভীর মমতায় হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলে, বুঝিয়েছিলে, জ্ঞানই আলো। শিখিয়েছিলে, সততাই আনন্দ। চলার পথে কোনো পিতাকে যখন দেখি, সন্তানকে হাতে ধরে স্কুলে নিয়ে যায়, তখন তোমার কথা মনে পড়ে যায়। কোনো কিছু লিখতে বসলে তোমার কথা অস্থির চিত্তে মনে পড়ে। মনে হয়, এই বুঝি এসে, স্বভাবসুলভ হেসে, ছোটোবেলার মতো আমার লেখাগুলো দেখে দেবে, কথাগুলো গুছিয়ে দেবে। সন্ধ্যার পর তোমার কাছে পড়তে বসতাম। তুমিই সমস্ত পড়া বুঝিয়ে দিতে। এখন সন্ধ্যার পর নিজের ছেলেকে যখন পড়া দেখিয়ে দিই, তখন তোমার কথা ভীষণ মনে পড়ে যায়। সেই চশমা পরা মুখখানি মনের গহিনে বারবার ভেসে ওঠে। এসএসসিতে যখন ভালো রেজাল্ট করলাম, খুব খুশি হয়েছিলে। সেই দিনের তোমার আনন্দ ভরা মুখচ্ছবি মনে পড়ে। সেদিন অফিস ছুটির পর অনেকগুলো মিষ্টির প্যাকেট একসঙ্গে হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলে। তোমার কষ্ট হচ্ছে মনে করে কে যেন ছুটে গিয়ে তোমার হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেট নিতে গেল। তখন তুমি বললে, ‘ভালো রেজাল্টের মিষ্টি এগুলো, এই প্যাকেটের যত ওজন, তত আনন্দ।’ কোনো পিতাকে যখন দেখি, সন্তানের রেজাল্টের আনন্দে মিষ্টির দোকানে ছুটে যায়, তখন বাবা তোমার কথা খুব মনে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে সার্টিফিকেট যখন তোমার হাতে দিলাম, তখন ভীষণ খুশি হয়েছিলে। বলেছিলে মা, এ তোর অর্জন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলেমেয়েদের যখন আনন্দ দেখি, তখন তোমার কথা মনে পড়ে যায়। অলস দুপুরে হঠাত্ নতুন একটা বই হাতে দিয়ে বলতে, ‘মা, বইটা পড়ে দেখ, অনেক ভালো লাগবে।’ বই পড়তে পড়তে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। যখনই নতুন বই পড়তে যাই, তখনই তোমার কথা বারবার মনে পড়ে। নিজের অজান্তেই বাবার পদধ্বনি শোনার অপেক্ষায় থাকি। পরক্ষণে নিজের ভেতরে প্রতিধ্বনি হতে থাকে, তুমি কোথাও নেই, কোথাও নেই।
পূর্ণিমা, অমাবস্যা, শুকতারা, ধ্রুবতারার সম্পর্কে তুমি বুঝিয়েছিলে। এখন পূর্ণিমা, অমাবস্যা, শুকতারা, ধ্রুবতারা— সবই দেখি। শুধু তোমাকে দেখি না। সেই ছোটোবেলায় সমুদ্র দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলে। সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে দেখি, বিশাল সমুদ্র । অনবরত জল তরঙ্গে চারদিক স্নিগ্ধতায় ঢেকে আছে। দূরে নীল আকাশ। সমুদ্রের বিশালতায় আমি মুগ্ধ। বাবাকে বিস্ময়ভরে বললাম, ‘সমুদ্র কি বিশাল!’ বাবা উত্তর দিয়েছিলে, ‘মা, বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মানুষ অনেক দূরে যায়। যখনই সমুদ্রের কাছাকাছি যাই, তখনই বাবার কথা মনে খুব পড়ে। আমি ছোটোবেলা থেকেই ঝড় প্রচণ্ড ভয় পাই। বজ্রপাত হলে তো উপায়ই নেই। একছুটে তোমার কাছে চলে যেতাম। তুমি তখন মজার গল্প বলে ভুলিয়ে রাখতে। যত দূরেই থেকেছি, ঝড় হলেই আমাকে ফোন করে বলতে কিরে মা, ভয় পাচ্ছিস, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঝড় থেমে যাবে। বাবা ঝড়ের দিনে তোমার কথা অনেক মনে পড়ে। বাতাসের প্রবল বেগের মাঝেও আমি যেন তোমার শব্দহীন কণ্ঠ শুনতে পাই। মনে হয়, আমায় বলছো’ কীরে মা, ভয় পাচ্ছিস, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঝড় থেমে যাবে। আসলে বাবা আমি ভুলেই যাই, তুমি চিরতরে হারিয়ে গেছো। চলে গেছো অজানা পৃথিবীতে। চাঁদরাতে তোমার ফোন আসতই। বলতে, ‘মা, ঈদ মোবারক। চাঁদ রাত আসে। ফোন আসে না। আমার জন্মদিনে সকালে ফোন করে বলতে,’ মা, শুভ জন্মদিন। আল্লাহ অনেক ভালো রাখুক, এই দোয়া করি। সেই ফোনটা আর আসে না। তখন তোমাকে খুব খুব মনে পড়ে।
n লেখক :গবেষক