নদনদী ফুঁসছে দুই জেলায় বন্যা

উজানের পাহাড়ি ঢল অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত এই পাহাড়ি ঢলের কারণে বাড়ছে দেশের নদ-নদীর পানি। এই ঢল অব্যাহত থাকলে চলতি মাস শেষে কুড়িগ্রাম থেকে সিরাজগঞ্জের নিম্নাঞ্চল বন্যায় আক্রান্ত হবে। এরই মধ্যে লালমনিরহাট ও রংপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এ সময়ে ঢাকার চারপাশের নদীসমূহের পানি সামান্য বাড়তে পারে ও নদীসমূহের অববাহিকায় বিপত্সীমা অতিক্রমের আশঙ্কা নেই।

এদিকে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে। দুই-তিন দিন পর বৃষ্টির এই প্রবণতা কমবে। তবে শুক্রবার থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গত ১৩ জুন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঐ সময় থেকে এখন পর্যন্ত কোথাও হালকা থেকে মাঝারি এবং কোথাও  কোথাও ভারী          থেকে অতিভারী বর্ষণ হচ্ছে।

এদিকে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র পূর্বাভাসে বলছে, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি আগামী ১০ দিন বাড়তে পারে। এই সময় কোনো কোনো জায়গায় পানি বিপত্সীমার ৫০ সেন্টিমিটারের মধ্যে চলে আসতে পারে। এর প্রভাবে এই মাসের শেষ নাগাদ কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা হওয়ার ৬০ ভাগ আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূইয়া ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যার কারণে লালমনিরহাট ও রংপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা শুরু হয়েছে। এছাড়া যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তা তিন দিন অব্যাহত থাকবে। তিনি জানান, নদীর ১০১টি  পর্যবেক্ষণ পয়েন্টের মধ্যে ৬৮টিতে পানি বেড়েছে। ৩৩টিতে হ্রাস পেয়েছে এবং একটি পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপরে পানি বইছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের গাণিতিক আবহাওয়া মডেলের তথ্য অনুযায়ী,  আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, তত্সংলগ্ন ভারতের আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে এ সময়ে আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীসমূহের পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, ভারতের উত্তরাঞ্চলের সিকিম ও জলপাইগুড়ি অংশে আগামী ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মৌসুমি বায়ুর অক্ষ উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর অপর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি থেকে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরসমূহের ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এজন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার,  মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

ছয় শতাধিক পরিবার পানিবন্দি

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের ফলে তিস্তা নদীতে পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সব কটি জলকপাট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।  উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ময়নুল হক বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউনিয়নের পূর্বখড়িবাড়ী, চরখড়িবাড়ী ও টাপুর চরের শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।  সেইসঙ্গে চরের বাদাম খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, তিস্তায় পানি বৃদ্ধির ফলে উপজেলার চরাঞ্চলে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কোলকোন্দ ইউনিয়নে বিনবিনা এলাকায় বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এলাকার একটি রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় সেই রাস্তা দিয়ে পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। কোথাও ভুট্টা ও বাদাম খেত তলিয়ে গেছে। লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, তার ইউনিয়নের শংকরদহ, ইচলি ও বাগেরহাট এলাকায় ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার রংপুর জানান, কয়েক দিনের বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা বরফ গলা পানিতে তিস্তার পানি বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে রংপুর বিভাগের রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার। শনিবার দুপুরে দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৭৮ সেন্টিমিটার। বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে শুক্রবার রাতে হঠাত্ বাড়তে থাকে তিস্তার পানি প্রবাহ। যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে শনিবার সকাল ৬টায় বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও ৩ ঘণ্টা পরে কিছুটা কমে সকাল ৯টার পর আবারও বিপত্সীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানের ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি বাড়ছে। তীব্র গরমে হিমালয় থেকে বরফ গলতে শুরু করলেও পাহাড়ি ঢল আসেনি এখনো। লালমনিরহাটের দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে গত শুক্রবার রেড এলাট জারির কথা নিশ্চিত করে আরো পানি বাড়ার শঙ্কা করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতিপ্রকাশ ঘোষ। তিনি জানান, কয়েক ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে প্রচুর। রেড এলাট জারি করা হয়েছে। আমাদের যে স্থাপনাগুলো তার কি অবস্থা, তা এখনো আমাদের কানে আসেনি।