আনুশে হোসেন
আমেরিকায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্লান্তি আর আতঙ্ক যেন জেঁকে বসেছে। যদিও গোটা দেশে বর্ণবাদবিরোধী যেই বিক্ষোভগুলো সংঘটিত হয়েছিল, সেগুলো ছিল অত্যন্ত সংঘবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলা। হিংসাত্মক ব্যাপারটা স্তিমিত হয়ে এসেছে, যতটা প্রথম দিকে দেখা গিয়েছিল। কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পরে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে বিক্ষোভকারীরা বর্ণবাদী সামরিক জেনারেলদের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন। বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন যে— বর্ণবাদ, দাসপ্রথা বা দাস ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িতদের মূর্তি প্রকাশ্যে রাখা চলবে না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি শহরে গত সপ্তাহে ইতালীয় অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। কলম্বাস সেই ব্যক্তি, যিনি ষোড়শ শতাব্দীতে আমেরিকায় এসে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের দাস হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মিনেসোটা ও ভার্জিনিয়া রাজ্য এবং বস্টন ও মিয়ামি শহরে কলম্বাসের মূর্তি ভেঙে ফেলেছে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভকারীরা।
আমেরিকার জাতিগত ক্ষত এবং এর শিকড় যখন সারা বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, তখন আমেরিকাতে প্রকৃতপক্ষে যা ঘটছে, তার আসল সংকট উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। এই সংকটের ভেতর দিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। জাতিগত বর্বরতা এবং পুলিশি সহিংসতার ভয়াবহতা সারা বিশ্বের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী গণতন্ত্রের দেশটি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে লক্ষ্য করে কীভাবে হত্যা করেছে। এই ব্যাপারটা প্রকৃতই আমেরিকাকে সংকটের মধ্যে ফেলেছে। এবং এই সংকট কেবল আমেরিকা জাতিগত সম্পর্কের মধ্যে নয়, তার বাইরেও চলে যাচ্ছে।
আমেরিকার বাইরে বেড়ে ওঠা অনেক মানুষের মতোই আমার মধ্যেও শৈশবে আমেরিকান টিভি শো এবং সিনেমাগুলো একটা ঘোর তৈরি করত। এটা বিশেষ বার্তা দিত। আমি সেভাবেই ভাবতাম আমেরিকা সম্পর্কে। এই ভাবনা বা ধারণাটি বেশ স্পষ্ট করে দিত আমেরিকার আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদির ব্যাপারে। ভালো মানুষ ও খারাপ মানুষের তুলনা, আইনি ব্যবস্থাদি টিভি ও সিনেমার পর্দায় আমি যা কিছু দেখেছি তাতে একটি বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল—আমেরিকাতে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সত্যিকার অর্থে এই বার্তাটি আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে যা ঘটেছে, সবই তার পক্ষে গেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়টি থেকে শুরু করে নির্বাচনের পর্নো-তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে অর্থ (হাশ মানি) দেওয়া, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সময় গত ২৫ জুলাই টেলিফোন আলাপের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেন এবং তার ছেলের ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ, ট্রাম্পের ট্যাক্স রিটার্নে নগদ অর্থ প্রদান করা—এসব ঘটনা কি বলে দেয় না যুক্তরাষ্ট্রের সিস্টেমের মধ্যে চেক ও ব্যালেন্স এবং জবাবদিহিতার যেই আদর্শলিপি আমাদের শেখানো হয়েছে, তা আসলে ঠিক নয়? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একের পর এক ঘটনা কী করে প্রমাণ করবে—এখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়?
দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে আমেরিকার একসময়ের নিখুঁত ভাবমূর্তি ছিল, ট্রাম্প নিরন্তর সেই ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা করে চলেছেন। এই ক্ষতি অপূরণীয়।
ট্রাম্পের প্রশাসনের সর্বশেষ চেষ্টা ছিল আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী প্রসিকিউটরকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এটা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতায় ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণ বই আর কিছু নয়। এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার আওতাধীন আইনের শাসনের প্রতি ট্রাম্পের একধরনের অসম্মানও বটে। অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বারের ঘোষণা যে, তিনি নিউ ইয়র্কের দক্ষিণী জেলা ইউএস অ্যাটর্নি অফিসের জেফ্রি বারম্যানকে বদলি করেছেন! বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অ্যাটর্নি জেনারেল আমেরিকার চেয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থকে যে পরিমাণে পরিচালনা করছেন—এই ঘটনা সেসব বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
এদিকে, পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বারম্যানের কার্যালয় ট্রাম্পের আইনজীবী রুডল্ফ গিলিয়ানি এবং সহযোগীদের তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এবং ইরান স্যানসান-সংক্রান্ত মামলায় জড়িত তুরস্কের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই তদন্ত বন্ধ করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেডারেল অ্যাটর্নি বারম্যানের অফিসকে চাপ দিয়েছিলেন। কিন্তু বারম্যানের অফিস সে চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি।
এটা অবিশ্বাস্য যে, আমেরিকায় এই ধরনের বিচিত্র দুর্নীতিবিষয়ক নাটক মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ট্রাম্পের নেতৃত্বে। সুতরাং এটা স্পষ্ট করেই বলা যায় যে, আমেরিকার সমস্যাটা কেবল জাতিগত নয়, বরং আরো অনেক গভীরে। আমি অনুভব করতে চাই সেই আমেরিকাকে, যাকে আমি একসময় চিনতাম। এখন মনে হয়, আমি যেন সেটাকে কেবল কল্পনাই করেছিলাম। সেই নান্দনিক আমেরিকা এখন আমার চোখের সামনে থেকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমেরিকা এখন একতাবদ্ধ নয়, বরং বর্ণভেদে বিভক্ত একটি দেশ, বিশ্বব্যাপী মহামারিতে পঙ্গু হওয়া দেশ। এখানে অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়েছে, লক্ষ লক্ষ বেকার এবং সারা দেশে বিক্ষোভ অব্যাহত। আমেরিকা কখনোই এই সময়ের চেয়ে বেশি অনিরাপদ ও নেতৃত্বহীন হয়নি। এবং আপনি এখন ভাবছিলেন যে এমন আর কিছু নেই, যা এই দেশকে আরো বিভক্ত ও খারাপ করে তুলবে, দেখুন কী অবস্থা—ট্রাম্প তার সমর্থকদের মাস্ক না পরতে উত্সাহিত করছেন এবং তারা তার কথা শুনছেনও।
আমেরিকা এই মুহূর্তে এতটাই বিভক্ত যে এটি মাস্ক পরার ওপরও বিভক্ত। এবং যদি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ ও কোনো বিপজ্জনক প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রকে খাদে ফেলার কাজটি শেষ করতে না পারে, তবে বাকি অংশটুকু সম্ভবত করোনাই করে দেবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ :তাপস কুমার দত্ত
n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ