মো. জাহিদ হাসান
করোনা ভাইরাসের বিস্তার উন্নত দেশগুলোতে ধীর হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসের বিস্তারটি উন্নয়নশীল বিশ্বে তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন তিন-চতুর্থাংশ নতুন কেস শনাক্ত করা হচ্ছে এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। মহামারিটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সমস্যার পাশাপাশি এটি অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে, যে সংকটের মূল হবে দারিদ্র্য। ফলস্বরূপ, বিশ্ব দারিদ্র্যের অবস্থানও পরিবর্তিত হবে। জাতিসংঘের অধীনস্থ সংস্থা ইউএনইউ-ওয়াইডার এক গবেষণা প্রতিবেদনে (জুন ২০২০) বলা হয়েছে, বিশ্বে মোট চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১১২ কোটিতে। বিশ্বব্যাংকের দেওয়া সংজ্ঞায়, চরম দরিদ্র হচ্ছে যখন মানুষের আয় দিনে ১৬১ টাকা ৪১ পয়সা (১.৯০ ডলার) বা তারও কম। এক্ষেত্রে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই দারিদ্র্য নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও।
সম্প্রতি, ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস ২০২০’ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, বিশ্বের মোট দরিদ্রের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বাস করে নাইজেরিয়া, ভারত ও কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মহামারির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি বাড়বে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারতে। বিশ্বব্যাপী ১৭ কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৩ দশমিক ২০ ডলারের (২৭১ টাকা) নিচে নেমে আসবে।
করোনা ভাইরাসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু হুমকির কারণ উল্লেখ করা যায়:
১. উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের মতে, করোনা মহামারির কারণে এ বছর সারাবিশ্বে রেমিট্যান্স কমবে ২০ শতাংশ। আর বাংলাদেশে কমবে ২২ শতাংশ। এ চিত্রের প্রতিফলন দেখা যাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তিন শীর্ষ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আয়ের ক্ষেত্রেও। ২. করোনার জন্য স্থবিরতার প্রভাব অচিরেই গিয়ে পড়বে চাকরির বাজারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, করোনা ভাইরাসের কারণে আগামী তিন মাসের মধ্যে বিশ্বে সাড়ে ১৯ কোটি মানুষ তাদের পূর্ণকালীন চাকরি হারাতে যাচ্ছেন। যার মধ্যে সাড়ে ১২ কোটি মানুষ বসবাস করেন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে। ৩. করোনা ভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি, এফডিআই বা বিদেশি বিনিয়োগ কমবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। গত ১৬ জুন জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংগঠন— UNCTAD জানিয়েছে, বিশ্বে বিদেশি বিনিয়োগ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ৪. রপ্তানি খাতে ধস উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড়ো সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে। যেমন: বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড়ো বাজার হচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকা। অথচ সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমিত হয়েছে এসব জায়গায়। করোনা ভাইরাসের কারণে ১ হাজার ১৫০ কারখানার ৩১৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে (প্রথম আলো, ৮ জুন ২০২০)। ৫. করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে। যা জন্ম দেবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার। করোনা ভাইরাস সংকটের মধ্যেই সরকার পতন হয়েছে ইউরোপের দেশ কসোভোয়। রাজনৈতিক অচলাবস্থার এ ধরনের ঘটনা আগামীর দিনগুলোতে অন্যত্র আমরা আরো প্রত্যক্ষ করতে পারি। ৬. করোনা ভাইরাসের কারণে অনেক দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গৃহযুদ্ধ, উদ্বাস্তু সংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সন্ত্রাসবাদের কবলে পড়ে আফ্রিকা মহাদেশ আজ দুর্দশাগ্রস্ত। ইথিওপিয়া, বুরুন্ডি, জিবুতি, কেনিয়া, উগান্ডা, সিয়েরা লিয়ন, ঘানা এবং নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আবার, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে করোনা ভাইরাস মহামারিতে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতিতে পড়েছে ইকুয়েডর, ব্রাজিল। ৭. উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনৈতিক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাব রয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল ফিলিপস্ হান্টিংটন তার বিখ্যাত বই ‘Political Order in Changing Societies’ (১৯৬৮) তে এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এসব দেশে রাজনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ হয়নি। তাই তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক ও দুর্বল। ৮. উন্নয়নশীল দেশগুলোতে লকডাউনগুলো কার্যকর করার সুযোগ নেই। কারণ, এসব দেশে ‘ওয়ার্কফ্রমহোম’এই সুযোগ খুব কম।
আলোচনাটি এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে যে, এই দেশগুলোতে পূর্ববর্তী দরিদ্র জনসংখ্যার বেশির ভাগ অংশ দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে উঠে গেছে। অন্য কথায়, এই দেশগুলোর সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে নাজুক হয়েছে। তানজানিয়া, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া এবং ডিআরসির মতো দেশগুলোতে গত তিন দশকের তুলনায় আমরা সম্ভবত নতুন দারিদ্র্য দেখতে পাব।
সংকট ক্রমবর্ধমান হচ্ছে। যদি তা বর্ধিত হতেই থাকে তবে এটি আগামী কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব ফেলবে। কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে তা নির্ধারণ করা কঠিন। সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি হবে উন্নয়নশীল বিশ্বের। করোনা ভাইরাসের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা এই দেশগুলোর পক্ষে কঠিন হবে।
n লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, মাস্টার্স (১ম সেমিস্টার), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়