সাবিহা খানম (একা)
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন লকডাউন বা ঘরবন্দি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লেখা হয়েছে—‘ঘরবন্দি মানুষগুলোর গুরুতর মানসিক সমস্যা হচ্ছে এবং বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি’। ঘরবন্দি মানুষের সংখ্যার দিক থেকে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ড্যান হুফ এ অবস্থাকে এযাবত্কালের সবচেয়ে বড়ো মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গৃহবন্দি এই মানুষগুলো নানা রকম মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে মন খারাপ, অনিদ্রা, বিষণ্নতা, বিভ্রান্তি, উত্কণ্ঠা, খিটখিটে মেজাজ, অবসাদ ও মানসিক চাপের নানা লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। ফেসবুকসহ বাংলাদেশের অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষ নিজেদের ভয়,আতঙ্ক, উদ্বেগের কথা লিখছেন। যেমন ধরেন—১. বেঁচে থাকলে দেখা হবে। ২. আর কিছুদিন বাসায় থাকলে পাগল হয়ে যাব।
নানা জাতীয় হতাশগ্রস্ত স্ট্যাটাস আমরা দেখতে পাচ্ছি এখন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো মানুষ বেশিদিন বাঁচতে পারে না। কিন্তু (কোভিড-১৯) এমন একটি রোগ, যা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে; আক্রান্ত ব্যক্তিকে তো বটেই সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যদেরও সমাজ থেকে একঘরে করছে।
২০১৯ সালের শেষের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষ হতাশায় ভুগছে। বাংলাদেশে তা মোট জনসংখ্যার ৪.৬ শতাংশ। (কোভিড-১৯) প্যানডেমিকে মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে বেশি হতাশায় ভুগছেন তার মধ্যে রয়েছে করোনার ভয়, চাকরি হারানোর ভয়, ব্যবসায় ক্ষতি, স্কুল/কলেজে যাওয়া ছেলেমেয়েদের আগে ছিল পারিবারিক বাধা আর এখন সমাজ ও আইনের বাধা। সিনিয়র সিটিজেনদের সেন্স অব ভয়েড আর ক্যারিয়ার সবেমাত্র শুরু করবে, এমন স্টুডেন্টদের হতাশার যেন কোনো শেষ নেই এই সময়ে। এসব হতাশা এক-এক করে বিল্ড আপ হয় এবং ক্রমে তা রাগ বা ক্রোধে পরিণত হয়।
লকডাউনরত অবস্থায় মানুষের আচরণে বিষণ্নতার প্রতিফলন বাড়ছে প্রকট হারে এবং বিভিন্নভাবে তা ব্যক্তি, সমাজ রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করছে।
করোনার ভয়ে মানুষের হতাশা, রাগ বা ক্রোধ এতটাই তুঙ্গে যে গত ১৫ জুন ২০২০ খুলনার রাইসা হসপিটালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের হামলায় প্রাণ হারান ড. রাকিবউদ্দিন। এ রকম আরো শত শত ঘটনা ঘটছে আমাদের আশপাশেই। তবে আপনি বা আমি হয়তো ইচ্ছা করলেই এই লকডাউনরত জীবনটাকে করে তুলতে পারি কিছুটা ভিন্নতর, যা আমাদের বিষণ্নতাকে কাটিয়ে তুলতে পারে।
* পরিবারের মধ্যে সময় দেওয়া। *টিভি নিউজ কম দেখে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো দেখলে বিষণ্নতা একটু হলেও রিলিভড পাবে। *গল্পের বই পড়া বা বিভিন্ন গল্পের অডিও ক্লিপ শোনা। *পছন্দের গানগুলো শোনা, বাড়িতে গিটার বা হারমোনিয়াম থাকলে নিজেও গাইতে পারেন। * প্রতিদিন ইয়োগা করতে পারেন। *আপনার নিজের ক্রিয়েটিভিটিগুলো উন্মোচন করার সব থেকে উপযুক্ত সময় এটি। তাই এ সময়টাতে বিষণ্ন না থেকে কাজের মাধ্যমে আপনি, আমি এবং আমরা সবাই পারি বিষণ্ন শব্দটিকে দূরে ছুড়ে দিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘যারা আগে থেকেই ভঙ্গুর মানসিকতায় বেঁচে আছেন, তাদের আত্মহত্যার জন্য (কোভিড-১৯) উপস্থিত হয়েছে একটি চূড়ান্ত সময় হিসাবে।’ হ্যাঁ, হয়তো-বা তাই। তবে মানুষ লড়াকু প্রাণী। লড়াই করে বেঁচে থাকতে শিখেছে। তাই তো এই বিষণ্নতার জাল থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে এবং একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়