আসিফ আহমেদ
করোনাকালে আশ্চর্য হতে হয় এই সময়েও যেখানে মানুষ করোনার ভয়ে সবাই ভীতশ্রদ্ধ, সেই সময়ে পত্রিকার পাতায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর পরিমাণে ধর্ষণের সংবাদ দেখি। ধর্ষণ হলো এক ধরনের যৌন আক্রমণ। সাধারণত, একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোই হলো ধর্ষণ। প্রথমত একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়, এরপর একসময় থেমে যায় সবকিছু। এ সময়ের মধ্যে তালিকায় আরো একটি ঘটনা যোগ হয়। দিন দিন ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। এর থেকে রক্ষা পাচ্ছে না শিশু, বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধী কেউই। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরাও সামিল হচ্ছে ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে। পিছিয়ে নেই মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমামও। এমনকি করোনা রোগীও রক্ষা পাচ্ছে না ধর্ষণ থেকে।
শুধু পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৪০০টি। এ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ধর্ষণের হার ৩ দশমিক ৮০ অর্থাত্ প্রতি ১ লাখ নারীর মধ্যে প্রায় চার জন নারী-শিশুকেই ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। ২০১৮ সালে ধর্ষণের হার ছিল ২ দশমিক ৪৫ জন। পরিসংখ্যান বিবেচনায় ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের হার বাড়ার পরিমাণ প্রতি লাখে ১ দশমিক ৩৫ বা এক-তৃতীয়াংশ। (বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ওয়েবসাইট, ২০১৯)। ২০২০ সালেও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলছে। ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে তনু, হিরা, মনিদের সিরিয়াল।
বাংলাদেশে ধর্ষণের পেছনে অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো বিচার ঠিকভাবে না হওয়া। বাংলাদেশে যে পরিমাণ ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, সে তুলনায় বিচারের হার অত্যন্ত কম। অধিকাংশ সময় বিচার পাওয়া তো দূরের কথা উলটো ভিকটিমের পরিবারকেই হেনস্তার শিকার হতে হয়। অবাধ পর্নোগ্রাফির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে স্বল্প সময়ের পরিচয়ের পর ঐ ছেলের সঙ্গে বাছবিচার না করে মেলামেশা, পাশের দেশের বিভিন্ন চ্যানেলে যে অশ্লীল শো দেখানো হয়, তা ধর্ষণের মতো অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। এছাড়াও রাস্তার পাশের খুঁটিতে কিংবা দেওয়ালে নগ্ন পোস্টার, টিভি চ্যানেলে যৌন উত্তেজক ওষুধের অবাধ বিজ্ঞাপন, অশ্লীল সিনেমা ও ওয়েভ সিরিজ, প্রেমে ব্যর্থতা ইত্যাদিও ধর্ষণের অন্যতম কারণ। তাছাড়া ছেলেমেয়ে ইন্টারনেটের কোন সাইট দেখছে, কেমন বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে মিশছে তা-ও অভিভাবকরা নজরে আনেন না। ফলে ছেলেমেয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হচ্ছে। এছাড়াও সন্তানদের ঠিক সময়ে বিয়ে না দেওয়ার ফলেও ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।
সমাজে ধর্ষণের মারাত্মক খারাপ প্রভাব রয়েছে। মানুষ স্বভাবগতভাবেই ন্যায়পরায়ণ। তাই তার প্রতি ঘটে যাওয়া অপরাধ দগদগে ঘায়ের মতো চিরস্থায়ীভাবে থেকে যায়, যা কোনো দিনও শুকায় না এবং ভিকটিম কখনোই ভুলতে পারে না। আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক শক্তি, সৃজনশীলতা, কাজ করার স্পৃহা, জীবনে কিছু করার বা হওয়ার স্বপ্ন, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার আনন্দ—এগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যাও করে। ধর্ষিতা এবং তার পরিবারকে সমাজে বিভিন্নভাবে হেয় হতে হয়। আবার অনেক বাবা-মা ভয়ে তাদের মেয়েকে বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ফলে মেয়েটির জীবনের সব স্বপ্ন, ইচ্ছা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের প্রতিবাদ ও প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন। এজন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ধর্ষণ প্রতিরোধে ধর্ষককে দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আনতে হবে। ২০০৩ সালে সংশোধিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের বিচারে যে সময় নির্ধারণ করা আছে, সে সময়ের মধ্যেই তা শেষ করতে হবে। পারিবারিকভাবে সন্তানের ওপর খেয়াল রাখতে হবে এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার থেকেই নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করার শিক্ষা দিতে হবে এবং ছেলে-মেয়েদের প্রতি অভিভাবকদের সুদৃষ্টি রাখতে হবে। কখন-কোথায় যায় সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। ধর্ষণ রোধে পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার রোধ করতে হবে। নারীর অধস্তনতামূলক থাকার প্রথা ভেঙে সমমর্যাদা ও সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করতে হবে। সর্বোপরি, ধর্ষণ প্রতিরোধে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়