মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই বাড়ছে চালের দাম। অথচ এখন বোরো মৌসুম চলছে। তাহলে চালের দাম বাড়ছে কেন? এদিকে চালের দাম বাড়ায় করোনা সংকটকালীন এ সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমজীবী মানুষ বিপাকে পড়েছেন। এছাড়া চালের দাম বাড়ায় মিলাররা সরকারের গুদামে চাল দিচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চলতি বোরো মৌসুমে ধানের উত্পাদন ভালো হয়েছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই কৃষক বোরো বিক্রি করে লাভের মুখ দেখছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির জন্য কৃষকরা প্রয়োজনের বেশি ধান বিক্রি করছে না। এছাড়া এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে আরো বেশি লাভের আশায় ধান-চাল মজুত করছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ধান-চালের বাজারে।
গত এক মাসের ব্যবধানে সব ধরনের ধানের দাম মণপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চালের দাম বেড়েছে প্রতি বস্তায় (৫০ কেজি) ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। বর্তমানে দেশের হাট-বাজারগুলোতে বিআর-২৮ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা মণ দরে। এছাড়া সরু জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে। অথচ গত বছর প্রতিমণ ধানের দাম ছিল ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা।
আর সরকারের বিপণন সংস্থা টেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গতকাল রবিবারের বাজারদরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি নাজিরশাইল/মিনিকেটে তিন থেকে ছয় টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬৮ টাকা কেজিতে। আর মাঝারি মানের চাল পাইজাম/লতা কেজিতে তিন টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫৫ টাকায়। মোটা চাল ইরি/স্বর্ণা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪৫ টাকায়। যদিও বাজারে মোটা চালের দাম আরো বেশি।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান মঞ্জু জানান, দেশে চালের সবচেয়ে সব মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে চালের দামের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। মোকামে চালের বাড়তি দামের কারণে খুচরা বাজারেও চালের দাম চড়া। এই মোকামের বড়ো ব্যবসায়ী দেশ এগ্রো ফুডের স্বত্বাধিকারী আব্দুল খালেক জানান, ধানের বাজার এবার চড়া। এ বাজারে ধান কিনে উত্পাদিত চালের মূল্য পড়ছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদ গতকাল ইত্তেফাককে জানান, প্রতিযোগিতার এই বাজারে কারসাজি করে কোনো মিলার চালের দাম বাড়াতে পারবে না। ধানের বাজার বাড়তি হওয়ায় চালের দাম বাড়ছে।
সরকারের গুদামে চাল দিচ্ছেন না মিলাররা
এদিকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বাজারে ধান-চালের দাম বেশি হওয়ায় সরকারের গুদামে চাল দিচ্ছে না মিলাররা। মিলারদের পাশাপাশি গুদামে ধান দিতে অনীহা কৃষকদেরও। এ অবস্থায় চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোনো কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার পর গত প্রায় দুই মাসে মাত্র ২৬ হাজার ১৪২ টন ধান, ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৭৫ টন সিদ্ধ চাল ও ১২ হাজার ৭৯৬ টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। যা সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ, ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
দিনাজপুর থেকে স্টাফ রিপোর্টার মো. মতিউর রহমান জানান, সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বাজারদর বেশি হওয়ায় মিলারদের সরকারি গুদামে চাল দিতে আগ্রহ নেই।
দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, বাজারে ধানের যে দর তাতে প্রতি কেজি চালের দাম পড়ছে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। কিন্তু সরকারি সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা। তাহলে সরকারের গুদামে কীভাবে চাল দেওয়া সম্ভব? এ অবস্থায় প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা সহিদুর রহমান পাটোয়ারী।
এ প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, চালকল মালিকরা লাভ বেশি হলে সরকারের গুদামে চাল সরবরাহ করবেন, কম হলে চাল দেবেন না—তা হবে না। তিনি বলেন, তাদের অতি লোভের কারণে যদি সরকারকে খাদ্য আমদানিতে যেতে হয় তাহলে তা সুখকর হবে না। তিনি চালকল মালিকদের চুক্তি মোতাবেক সঠিক সময়ে চাল দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকারিভাবে চালের মূল্য কোনোভাবেই বৃদ্ধি করা হবে না।। চুক্তিবদ্ধ কোনো মিলার যদি চাল সরবরাহ না করে তাহলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।