বাজেট ২০২০-২১

ড. এম এম আকাশ

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করেছেন। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এ নিয়ে আলোচনা চলবে। তারপর হয়তো সামান্য কিছু সংশোধনসহ তা গৃহীত হবে। তারপর আগামী ২০২০-২১ সালে এই দলিল ধরেই সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করবে। এবারের বাজেট মোট ব্যয়ের হিসাব  ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এতে এবার ঘাটতি ধরা হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৩৩ শতাশ)। এই ঘাটতির ৪২ শতাংশ পূরণ করা হবে বিদেশি সাহায্য থেকে, আর ৪৪ শতাংশ আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ধার হিসেবে। বাকিটা অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ২ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ৯২ শতাংশই নির্ভর করবে ঘাটতি অর্থের সংস্থানের ওপর। তবে সব সময় সংশোধিত এডিপি আরো কমে সংশোধিত ঘাটতি আরো বেড়ে যায়, তাই ভবিষ্যতে অবস্থার আরো অবনতি হওয়াই স্বাভাবিক।

বাজেটের পটভূমি

এবারের বাজেটের বিশিষ্টতা হচ্ছে একটি বৈশ্বিক মহামারির সংকটের পটভূমিতে এবারের বাজেট প্রণীত হয়েছে। স্বভাবতই বিপর্যস্ত মানুষ এই বিপর্যস্ত বিশ্বে কষ্টে আছে। অন্তত মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন—এই চার মাস বাংলাদেশে মহামারির ক্রমপ্রসারমাণ সংক্রমণ ও বহু অপ্রত্যাশিত মৃত্যু আমরা দেখছি। সবচেয়ে বড়ো যে ক্ষতিটা হয়েছে তা হচ্ছে মানুষে মানুষে একধরনের বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। 

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় মানুষ যেন মানুষকে ভয় করছে। অবশ্য এ কথাও সত্য এত ভয়ভীতি সংক্রমণ আশঙ্কার মধ্যেও অনেক ডাক্তার, অনেক পুলিশ, অনেক স্বেচ্ছাসেবী গণসংগঠনকর্মী অকুতোভয়ে কাজ করেছেন। ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন, দরিদ্র মানুষকে রিলিফ বণ্টন করেছেন, স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। তার পরও পুরো ভয় এখনো কাটেনি। সংক্রমণরেখা এখনো  ঊর্ধ্বগামী। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত্।

প্রশ্ন হচ্ছে এই ‘ভীতি’ ও ‘বিচ্ছিন্নতার’ ফলাফল অর্থনীতিতে কী হয়েছে? আমরা দেখেছি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ছাড়া অন্য সব বাজার বন্ধ হয়ে গেল। শিল্প উত্পাদনও সর্বত্র থেমে গেল। আমদানি-রপ্তানি, বন্দর, রাস্তাঘাট, অর্থনীতির শিরা-উপশিরাগুলিতে রক্তপ্রবাহ থেমে গেল। অনেক এসএমই বন্ধ হয়ে গেল। লক্ষ লক্ষ লোক বেকার হয়ে গেল। ছুটি অথবা লকডাউন ঘোষিত হলো। ব্যাপক মানুষ শহর থেকে গ্রামে চলে গেল। শহরের মানুষ নিজ নিজ গৃহে গৃহবন্দি হয়ে পড়ল। ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো বাইরে থেকে প্রবাসী শ্রমিকরা বেকার হয়ে দেশে ফিরতে লাগল।

অর্থনীতিবিদরা প্রতিদিন নতুন নতুন ভয়াবহ সব স্ট্যাটিসটিকস হাজির করলেন। প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নেমে আসবে, খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে, দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হবে। আমাদের অর্থনীতিতে বহু লোক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তারা কোনো বেতন বা রোজগার এই সময় পাবে না। তারা বেঁচে থাকবে কী করে? ইত্যাদি আশঙ্কার কথা আমরা সবাই জানি।  এই পটভূমিতেই ঘোষিত হয়েছে এবারের বিশাল ঘাটতির বিশাল বাজেট।

সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর উপায়

পৃথিবীতে যারা সাফল্যের সঙ্গে করোনা সংকট মোকাবিলা করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যেমন—চীন-ভিয়েতনাম-কেরালা-নেপাল, তাদের দিকে তাকালে আমরা একটা প্রধান শিক্ষা পাই, শিক্ষাটি হচ্ছে ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’। চীন বা ভিয়েতনামের নেতৃত্ব প্রথমেই বুঝে গিয়েছিলেন—‘বিপদের ভয়াবহতা’। নেপালও সেটা কিছুটা বুঝেছিল। আর কেরালা তা বুঝে দলমতনির্বিশেষে ‘মুখ্যমন্ত্রীর’ নেতৃত্বে মাঠে ময়দানে জনসচেতনতা বৃদ্ধির অভিযানে প্রথম থেকেই ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন। পক্ষান্তরে আমাদের সরকার কিন্তু এই সংকটকে প্রথম দিকে এতটা গুরুত্ব দেয়নি। যদিও আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিকে মার্চ মাসে দেশের ভেতরে প্রথম আক্রান্ত আবিষ্কার হওয়ার পরপরই ঘোষণা করেছিলেন যে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়’ সমস্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে করোনাকে ঠেকাতে হবে কিন্তু সেরকম কোনো দৃঢ় ঐক্যবদ্ধ জাতীয় উদ্যোগ গড়ে তুলতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বিএনপির কথা বাদ দিলেও এমনকি ১৪ দল ও বামপন্থিদেরও ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামানো সম্ভব হয়নি। আমরা একদম প্রথম দিকেই বিদেশ প্রত্যাগত করোনাবাহী যাত্রীদের টেস্ট করে চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে বর্তমানে এই প্রলম্বিত সংকটের বোঝা আমাদের টানতে হতো না। তবে এত কিছুর পরেও এখনো পর্যন্ত আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিনটি  রিজার্ভ শক্তি আছে। সেগুলি হচ্ছে— ক) আমাদের কৃষি উত্পাদন তেমন একটা ব্যাহত হয়নি। খ) আমাদের সংক্রমণের হার দ্রুত প্রসারিত হলেও মৃত্যুর হার ততটা বেশি নয়। ডিসেম্বর নাগাদ করোনা টিকাও আবিষ্কার হয়ে যেতে পারে! গ) আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার এত কিছুর পরেও যথেষ্ট শক্তিশালী; যে কারণে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে হয় না। তবে তার শর্তগুলো কঠিনতর হবে এবং এর কাঠিন্য  নির্ভর করবে আমাদের ভূরাজনৈতিক কৌশল ও দরকষাকষির দক্ষতার ওপর।

বাজেটের রণকৌশল

২০২০-২১-এর প্রস্তাবিত বাজেট দলিলের চতুর্থ পৃষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী-ঘোষিত ১ লাখ কোটি টাকার এক অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্যাকেজকে সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই প্যাকেজকে অনুসরণ করে সংকট মোকাবেলার জন্য প্রধান চারটি নীতি পরার্শ দেওয়া হয়েছে—

১। সব বিলাসী ব্যয় কমানো হবে এবং সেই সব সরকারি ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে যা উত্পাদনশীল কর্মসুযোগ সৃষ্টি করবে।

২। বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ভর্তুকি সুদে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদারভাবে ঋণ দেওয়া হবে, যাতে তারা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় চালু করতে পারে এবং প্রতিযোগিতাক্ষম করে তুলতে পারে।

৩। সামাজিক সুরক্ষার যে জাল রয়েছে তার সুযোগ ও পরিধি আরো বিস্তৃত করা হবে। বিশেষ করে হতদরিদ্র এবং নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন যারা তাদের খাদ্যনিরাপত্তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে।

৪। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্ভবমতো মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা হবে।

এই ঘুরে দাঁড়ানোর চার দফার কৌশলটি সুবিবেচিত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এগুলোকে বাজেটে প্রকৃত আয়-ব্যয় প্রস্তাবে রূপান্তরিত করা হয়নি। বাজেট বাস্তবায়ন কৌশল, এলাকাভিত্তিক ম্যাপিং, সেগুলোর সম্ভাব্য ব্যস্টিক (Disaggregated) ফলাফলের চিত্র, ভবিষ্যত্ অগ্রগতির তত্ত্বাবধান ও সামগ্রিকভাবে সরকারি ব্যয়ের গুণমান রক্ষা ও সুশাসনসংক্রান্ত কোনো বিস্তারিত দিগ্দর্শন বাজেট দলিলের পরবর্তী ১০০ পৃষ্ঠায় কোথাও চারটি মূলনীতির শিরোনাম ধরে ধরে আলোচনা করা হয়নি।

এখানে আরো কয়েকটি প্রশ্ন আছে, যার কিছুটা উত্তর ও দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকা উচিত ছিল। এটা মোটেও স্পষ্ট নয় যে, কীভাবে দরিদ্র ও নতুন দরিদ্ররা উপকৃত হবেন এবং তাদের মোট সংখ্যা কত ধরা হয়েছে ও কীভাবে তাদের কাছে কত অর্থ বা খাদ্য প্রদান করা হবে। সামাজিক সুরক্ষা খাতের বর্ধিত বরাদ্দ তার জন্য পর্যাপ্ত হবে কি না এবং ঠিকমতো তাদের কাছে তা পৌঁছাবে কি না। তাছাড়া ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলো কোনো ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ছাড়া কোনো লোন আদৌ ডিসবার্স করবেন কি? এখনো করেছেন কি? সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে—স্বচ্ছতা (Transparency), কণ্ঠ (Voice) ও জবাবদিহিতা (Accountability) নিশ্চিত করা না গেলে এসব বর্ধিত বরাদ্দ নয়-ছয় হয়ে কোথায় যে শেষে চলে যাবে—সেটা নিয়ে জনমনে এরই মধ্যে বহু শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া ঠিকমতো এই বিশাল কর সংগ্রহ না হলে, ঘাটতি যথাযথভাবে পূরণ না হলে, বাজেটের সব খাতেই ব্যয় সংকুলান নিয়ে যে টানাটানি হবে—তাতে শেষে গিয়ে বাজেট শৃঙ্খলা ঠিক থাকবে কি?

আমার মনে হয় বরং সরকারকে এবার কতকগুলো ন্যূনতম লক্ষ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে দুর্যোগকালীন পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তৈরি করে তা ঠিকমতো কার্যকর করতে হতো। স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি উন্নয়ন—এই তিনকেন্দ্রিক কর্তব্যকে গুরুত্ব দিতে হতো। ‘বরং কম কিন্তু ভালো’ (Power but better) এরকম একটি নীতি নিয়ে অগ্রসর হলেই ভালো হতো।

 দুর্ভিক্ষ আমরা ঠেকিয়েছি, এখন গ্রামে ও শহরে চরম দরিদ্র ও একদম কর্মহীনদের সঠিক তালিকা তৈরি করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দুর্নীতিহীন ভাবে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার একটি টার্গেট নিয়ে এগোলে ভবিষ্যতেও আর কেউ না খেয়ে মরবেন না।

সবার জন্য স্বাস্থ্য ও খাদ্যের অধিকার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, বিশ্বমন্দা শিগিগর দূর নাও হতে পারে। সুতরাং আমাদের ভরসা করতে হবে ‘অভ্যন্তরীণ বাজার’ভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ওপর। তাই কৃষি, গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এরই মধ্যে শাইখ সিরাজ প্রস্তাব দিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিকে শ্যামল করায় বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন—সেটা বিবেচনায় নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের জন্য কৃষিভিত্তিক নতুন কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা যেতে পারে। শুধু কৃষির বহুমুখীকরণ নয়, আমাদের রপ্তানিরও বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। এবার একক রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পের মালিকদের কর্মকুশলতা খুবই হতাশাজনক ও সমন্বয়হীন ছিল। এর ওপর যদি এখন সেখানে ব্যাপক ছাঁটাই ও শ্রম অসন্তোষ দেখা দেয়—তাহলে সেটা মোটেও ভালো হবে না। তাই আমাদের চামড়া, পাট, কৃষিজাত পণ্য ইত্যাদি অন্য রপ্তানিগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কারণ এগুলোর পশ্চাদ্বর্তী সংযোগ দেশের ভেতরেই অবস্থিত।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক,

অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়