ফারজানা রহমান
শুরু থেকেই করোনার মাহামারিত্ব প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নানা ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় লকডাউন করা হয়েছে। হ্যান্ড ওয়াশ পয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে। স্প্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাস্ক ব্যবহারে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে যথেষ্ট তাগিদ দেয়া হয়েছে। করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে সরকারি-বেসরকারি, সাংগঠনিক এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাধ্যমত নানা ধরনের সহায়তাও করা হয়েছে। এত সব ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ কেন নেয়া হয়েছে? করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে আমাদের তথা এদেশের মানুষগুলোকে বাঁচাতে, তাই তো? কিন্তু যাদের জন্য এতসব ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেই ‘আমাদের’ কাছে বিষয়গুলো কতখানি গুরুত্ব পেয়েছে বা আমরা কতখানি গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়গুলো মেনেছি কিংবা কতখানি দায়িত্বশীলতা প্রদর্শণ করতে পেরেছি বা আমরা কতখানি সচেতন হয়েছি? সেটাই বিবেচ্য।
আমরা উন্নত জাতি, সৃষ্টির সেবা জীব। কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় ও স্বাস্থ্য বিধি মানার ক্ষেত্রে আমরা কি সৃষ্টির সেরা জীব ‘মানুষ’ হিসেবে সেই সাক্ষরটুকু যথাযথভাবে রাখতে পেরেছি? স্বাস্থ্য বিধি মানাতে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পুলিশ, সাংবাদিক, চিকিত্সক, জনপ্রতিনিধি, সমাজ সেবকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলস কাজ করছেন। সেবা দিতে গিয়ে, আমাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে গিয়ে উল্লেখিত পেশার মানুষগুলো বহর ধরে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক আত্মবিসর্জন দিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন পরপারে। কিন্তু তাতে কি লাভ হয়েছে সেই আত্ম বিসর্জনকারীদের? তারা কি আমাদেরকে পুরোপুরি সচেতন করতে পেরেছেন? আমরা কি ততখানি সচেতন হয়েছি? যতটুকু হওয়া দরকার। এই প্রশ্নটি আমাদের জন্য কতখানি অসম্মানজনক সেই বোধটুকু আমাদের অনেকের মাঝে আছে কি? হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, দোকানপাটসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর দিকে তাকালে সেখানকার চিত্র বলে দেয় আমরা কতখানি সচেতন। আমার কাছে আমারই জিজ্ঞাসা, কবে আমাদের বিবেক জেগে উঠবে? আমরা নিজেদেরকে কবে বদলাতে পারব? আর কত হারানোর পর আমরা নিজেদেরকে শোধরাতে শিখব?
‘‘অহেতুক বাইরে অবস্থান করবেন না। ঘরে থাকুন। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলুন। করোনার কবল থেকে নিজে বাঁচুন এবং অন্যকে বাঁচতে সহায়তা করুন। প্রয়োজনীয় কাজটুকু সেরে দ্রুত ঘরে ফিরে যান।’’ দিন রাত মাইকে এ সব সতর্কবার্তা ফুঁকিয়ে মানুষকে সতর্ক করে চলেছেন আমাদের ধামারাইয়ের উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মো. রবিউল করিম ভাইসহ অনেকে। মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে এক সময় নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপরও থামেন নি।
‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই তত্ত্বকথাকে মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে সহকর্মীদের নিয়ে মাইক ফুঁকিয়ে রাত দিন পরিশ্রম করে নানা রকমের সেবা দিয়ে চলেছেন একই উপজেলার ওসি দীপক চন্দ্র সাহা। সেবা দিতে গিয়ে তার ১১ জন সহকর্মী করোনায় আক্রান্তের শিকার হয়েছেন। এদের মতো আরো অগণিত মানুষ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের কল্যাণে। আত্ম বিসর্জনকারী ও কল্যাণকামী ব্যক্তিবৃন্দের কথা আমরা যদি মনোযোগ দিয়ে শুনি এবং মানি তবেই সকলের শ্রম ও ত্যাগ স্বার্থক হবে। অন্যথায় সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। ভয়ংকর ও নির্মমভাবে আমাদের নিপতিত হতে হবে করোনার করাল গ্রাসে। এখনও সময় আছে। আসুন আমরা আরও সচেতন হই। নিজে বাঁচি, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করি।
n লেখক :এমএসসি ভূ-গোল ও পরিবেশ বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা