আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম একটি দল। এই দলটির কাছ থেকে বাঙালি ও বাংলাদেশ যতটুকু পেয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে আর কোনো দলের কাছ থেকে পায়নি। সূচনা থেকেই আওয়ামী লীগ বাঙালির স্বার্থসংক্রান্ত ৪২ দফা দাবি নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিল। উল্লেখ্য, এই ৪২ দফাই ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা হয়েছিল এবং কালক্রমে ১৯৬৬-তে ছয় দফা হলো। এই ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন হয়েছিল এবং তারপর মুক্তযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেননি। কারণ তিনি পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন। কিন্তু তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতাভিত্তিক প্রস্তুতি কতদূর সঠিক ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল যখন জাতীয় চার নেতা সুচারুভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও সমাপ্ত করলেন। সুতরাং আওয়ামী লীগ শুধু বাঙালিকে সংগ্রামী করে তোলেনি বরং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণে এই দলটির নেতৃত্ব ইতিহাস স্বীকৃত। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়বার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে এই দলটির অবদান স্বীকার্য। ’৭৫-এর পরই আগস্ট পর্যন্ত বাঙালির যে অগ্রযাত্রা তা বিরুদ্ধস্রোতের পরে। ১৯৭৫ থেকে ’৯৬—এই ২১টি বছর বাংলাদেশে দুটো প্রবণতা লক্ষণীয় ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পাকিস্তানিকরণ ও রাজাকারায়ন। তারপর ’৯৬-এ আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার ফলে বাংলাদেশ আবার মুক্তিযুদ্ধের দিকে ফিরতে শুরু করে। ১৯৮১-র মে থেকে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন; তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যা পেয়েছে, তা সারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা শেখ হাসিনাকে বন্ধুর পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। তার জীবনের ওপর ১৯ বার আঘাত এসেছে। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে নির্মূল করতে চেয়েছিল। স্রষ্টার অপার কৃপায় শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন এবং দেশের হাল ধরে আছেন, যা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অর্জন। প্রায় ষাটের দশকের পথপরিক্রমায় আওয়ামী লীগ অনেক চড়াই-উতরাই পথ পার করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কিছু পর্যাবেক্ষণমূলক মন্তব্য প্রাসঙ্গিক। আওয়ামী লীগই একমাত্র দল, যা বাঙালির মনস্তত্ত্ব ও মানসিক চাহিদার দিক সম্পর্কে সচেতন ছিল। সে কারণে ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত হয়েছিল। অর্থাত্ সেই সময় আওয়ামী লীগ ও বাঙালি একাকার হয়ে গিয়েছিল। যে প্রক্রিয়ার যথাযথ অনুঘটক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সুতরাং দল হিসেবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্বতন্ত্র। ২. সাম্প্রতিক কালে আওয়ামী লীগের সংঠনের ত্রুটি আমাদের জন্য যথেষ্ট মানসিক অতৃপ্তির কারণ। দল ও সরকার একাকার হওয়া অগণতান্ত্রিক, যা বঙ্গবন্ধুর সময়ও ছিল না। দল ও সরকার একাকার হলে দলও ভালো চলে না, সরকারও ভালো চলে না—যার প্রমাণ বিরাজমান। ৩. বঙ্গবন্ধু মাত্র ১৭ বছরের মধ্যে (১৯৫৩-১৯৭০) দলের ভেতরে নেতৃত্ব তৈরি করেছিলেন, যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিসমাপ্তি নিশ্চিত হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা প্রায় চার দশক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এমন নেতৃত্বের দেখা আজও মেলেনি। যদি কোনো কারণে শেখ হাসিনা অপারগ হন নেতৃত্ব দিতে, তখন দলের হাল ধরবে কে—তা আমরা জানি না, যা আসলে দলের জন্য একটি অশনিসংকেত। ৪. সাম্প্রতিক কালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সুসম্পর্ক মর্মপীড়ার কারণ। অর্থাত্ দলের আদর্শবিচ্যুতি একটি বড়ো ব্যাপার। আওয়ামী লীগকে আওয়ামী লীগ হয়ে টিকে থাকতে হবে এবং তা বাঙালি ও বাংলাদেশের জন্যই। (অনুলিখন : সৌরভ জাহাঙ্গীর)  লেখক :ইতিহাসবিদ