‘আমরা একেক জন প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫টি স্যাম্পল কালেকশন করি। অধিকাংশ সময় সাপ্তাহিক ছুটিও পাই না। আর টানা কাজ করলেও আমাদের চিকিত্সকদের মতো আইসোলেশন সুবিধা নেই। আলাদা থাকার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও নেই। আর পরিবারের সঙ্গে আলাদা সময় কাটানোর জন্য ছুটি তো দূরের কথা। কেবল আক্রান্ত হলেই আমাদের ছুটি মেলে!’ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই বলছিলেন করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহকারী টেকনোলজিস্ট আব্দুর রশিদ। কাজ, ছুটি নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও মানুষের জন্য কিছু করতে পারছেন—এ কারণে যতটুকু তৃপ্তি। আগ্রহ নিয়ে দিন শুরু হলেও হতাশা দিয়ে শেষ হয়। আব্দুর রশীদ আহমেদ বলেন, আমরা যখন পিপিই পরে বাইরে যাই তখন এলাকার লোকজন এমনভাবে দেখে মনে হয় চিড়িয়াখানার কোনো প্রাণী। এমন পরিস্থিতিতে কখনো কখনো স্যাম্পল না নিয়েই চলে আসতে হয়। বাড়িওয়ালা বা এলাকাবাসীর ভয়ে অনেকে আমাদের ফোনও রিসিভ করেন না। কেউ কেউ অনুরোধ করেন বাইরে রাস্তায় কোথাও যেন স্যাম্পল কালেকশন করি। কিন্তু সেটা তো নীতিমালার মধ্যে পড়ে না। তবুও আমরা যতদূর সম্ভব পরিচয় গোপন করে স্যাম্পল সংগ্রহের চেষ্টা করি। স্ত্রীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। তার পরও ভাড়া বাসায় পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় সাত-আট জন মিলে আইইডিসিআরে থাকেন।
গোলাম মোস্তফা নামে আরেক জন টেকনোলজিস্ট বলেন, দিন দিন রোগী বাড়ছে। মানুষ মারা যাচ্ছেন। পরিবারের সঙ্গে থেকে কাজটা করতে হয়। ফলে পরিবারের ঝুঁকির কথা চিন্তা করে তাদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। গ্রামের বাড়িতে থাকা স্বজনরা উদ্বিগ্ন। তবে বছরখানেক আগে বাবা মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, আমি যেন মানুষের জন্য কাজ করি। বাবার সেই চাওয়াই আমাকে সাহস দেয়। তিনি বলেন, আমরা সরাসরি কোভিড রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে কাজ করি। তাই করোনায় আমাদের জীবনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তার মতে, এখন মানুষের মধ্যে ভয় কমছে। কারণ অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। আমার ভালো লাগে যখন দেখি যে আমার শিশু সন্তানও জানে বাবার কাছে যাওয়া যাবে না। তবে এর পরেও অনেকেরই মানসিকতায় খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। গোলাম মোস্তফা বলেন, আরেকটি সমস্যা মানুষের সন্দেহ। যখন নমুনা সংগ্রহের নামে ডাকাতির কথা ছড়িয়ে পড়ল তখন তারা বেশ বিপাকে পড়ে যান। পরিচয়পত্র দেখিয়েও কাজ হয় না। মাইনুল ইসলাম নামে তাদের এক সহকর্মীকে ডাকাত সন্দেহে পুলিশে দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
সরাসরি স্যাম্পল কালেকশন না করলেও টেস্টের সঙ্গে জড়িত রাকিব হাসান জানান, আমি যে এলাকায় থাকি সেই এলাকার লোকজন আগে আমাকে ভয়ের চোখে দেখতেন। তবে এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কেউ কেউ সহযোগিতা চান। কিন্তু বাড়িতে বাবা-মা তাকে নিয়ে চিন্তা করেন। চাকরি ছেড়েও দিতে বলেছেন কয়েকবার। কিন্তু রাকিবের কথা, আমি যদি চাকরি ছেড়েও দেই তাহলে কাউকে না কাউকে তো কাজটা করতেই হবে। তিনি বলেন, প্রথম যখন করোনা টেস্ট শুরু হয় তখন পিসিআর ল্যাবে আমি একা ছিলাম। এরপর আরো ১০/১২ জন যোগ দেন। তাদের মধ্যে কয়েক জন ভয়ে চাকরি ছেড়ে চলেও গেছেন। কেউ কেউ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।
আকলিমা আক্তার নামে আরেক জন বলেন, আমাদের প্রথম দিকে খুবই নিম্নমানের পিপিই দেওয়া হতো। এখনো এন-৯৫ মাস্ক সবাইকে দেওয়া হয় না। কেউ আক্রান্ত হলে তাদের নিজেদের উদ্যোগেই চিকিত্সা নিতে হয়। আমরা যে ঝুঁকি নিই তার জন্য আলাদা কোনো ঝুঁকি বা চিকিত্সা ভাতা দেওয়া হয় না। আর বেতন গড়ে ২৫-৩০ হাজার টাকা। অন্য কোনো সুবিধা বা ভাতা নাই। তিনি আরো বলেন, যারা নমুনা সংগ্রহ করেন তারা কেউ-ই তাদের পিপিই এবং সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে তেমন সন্তুষ্ট নয়।