চট্টগ্রামে করোনা চিকিত্সা ও নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় চলছে নৈরাজ্য অবস্থা। করোনা রোগীর চিকিত্সায় বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। একদিকে যেমন অক্সিজেন সিলিন্ডারের সমস্যা, অন্যদিকে আইসিইউ সমস্যার কারণে করোনা রোগীদের অনেকেরই করুণভাবে মৃত্যু হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সিলিন্ডার, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম এবং আইসিইউ সুবিধা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চট্টগ্রাম মহানগরীর ১২টি বেসরকারি হাসপাতালে ১০১টি আইসিইউ বেড থাকলেও গত তিন মাসেও কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক আইসিইউ উন্মুক্ত করা যায়নি।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানান, তার চার ভাগের এক ভাগ কোভিড-১৯ রোগী রাখার জন্য অনেক দিন ধরে বলা হচ্ছে। করোনা রোগীর সাধারণ শ্বাসকষ্ট, এজমা কিংবা সাধারণ ক্রিটিক্যাল রোগীর জন্যও পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও আইসিইউ কিংবা এইচডিইউ বেড পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। কারণ হাসপাতালে টেলিফোন করলে প্রথমে বলা হয় রোগী পাঠিয়ে দেন। কিন্তু যাওয়ার পর এক্স-রেসহ কয়েকটি পরীক্ষা করার পর বলা হয় সিট নেই। এমনকি কোভিড রোগী সন্দেহ হলে জরুরি বিভাগে সাধারণ সিলিন্ডার অক্সিজেন সাপোর্ট না দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আবার অনেকে রোগী ভর্তি করালেও নিজ দায়িত্বে কোভিড পরীক্ষা করার জন্য বলা হয়। এর মধ্যে রোগীর সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম থেকে হাই ফ্লো অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়লেও তা সরবরাহ না করায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ার নজিরও রয়েছে। শুধু কোভিড-ননকোভিড রোগ পরীক্ষা নিশ্চিত হতে না পেরে কোনো প্রকার চিকিত্সাসেবা ছাড়াই মারা যাচ্ছে অনেকে। আবার অনেকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে পথেই মারা যাচ্ছে।
এদিকে অক্সিজেনের অপ্রতুলতার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা শুধু অক্সিজেন সিলিন্ডার খাতে বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেকে নিজ দায়িত্বে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে নিচ্ছে। চট্টগ্রামে সরকারি পর্যায়ে শুধু চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম চালু রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে থাকলেও তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকারি জেনারেল হাসপাতালেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম শিগিগর চালু হবে বলে জানানো হয়। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং নতুনভাবে সরকারের অধীনে আনা হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে সর্বমোট ২৫টি আইসিইউ বেড রয়েছে বলে সিভিল সার্জন অফিস থেকে জানানো হলেও তার কয়েকটি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর থাকে না বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের অধীনে হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালকে দ্বিতীয় ইউনিট হিসেবে নেওয়া হলেও তার লোকবল ও ব্যবস্থাপনায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। একইভাবে নিয়োগ দেওয়া চিকিত্সক, নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খাবারসামগ্রী না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন। এমনকি এখানে আটটি আইসিইউ বেড সুবিধার কথা বলা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর নয় বলে ঐ চিকিত্সাকেন্দ্রের একজন চিকিত্সক জানান। হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক রোগী ভর্তি হয়েও ফিরে আসছে বলে জানা যায়।
চট্টগ্রামে অক্সিজেন সংকটের পাশাপাশি নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেও বিড়ম্বনার শেষ নেই। সম্প্রতি ৩ হাজারের অধিক নমুনা ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও গত ১৫ দিনেও সবগুলো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম শহরে চারটি কেন্দ্রে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া একটি বেসরকারি হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা করে আসছে। কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে একটি পরীক্ষা ল্যাব রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে শেভরন নামে একটি প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার আজ বুধবার থেকে নমুনা পরীক্ষা শুরু করবে বলে জানা যায়।
চট্টগ্রামে বর্তমানে ১০টি কেন্দ্রে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনা পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রামে আরো ২০-২৫টি ল্যাব প্রয়োজন বলে চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ডা. মাহফুজুর রহমান জানান। চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিত্তশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিত্সাকেন্দ্রে চিকিত্সা যন্ত্রপাতি ও সামগ্রী প্রদান করলেও তা সমন্বিতভাবে হচ্ছে না বলে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অভিমত। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ইত্তেফাককে বলেন, করোনা চিকিত্সায় প্রথম দিকে যে সমস্যা ছিল, তা ধীরে ধীরে সমন্বিত প্রচেষ্টায় কাটিয়ে উঠছে। তিনি বলেন, রাতারাতি আইসিইউ বেড সংবলিত ইউনিট তৈরি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্সসহ টেকনেশিয়ান। তবে তিনি বলেন, এর বিকল্প হিসেবে হাইফ্লো নজল ক্যানোলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা গেলে অক্সিজেননির্ভর রোগীদের সেবা বৃদ্ধি করা যাবে। পোর্ট সিটি মেডিক্যাল কলেজের চেয়ারম্যান আ জ ম নাছির উদ্দীন জানান, পোর্ট সিটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে ২৫০ বেডের কোভিড হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এস আলম গ্রুপের সঙ্গে এক বৈঠকে এসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এস আলম গ্রুপ আইসিইউ, এইচডিইউ সংবলিত ২৫০ বেডের কোভিড রোগীদের জন্য এ হাসপাতাল তৈরি করবে। তারা এর ডাক্তার, নার্সসহ সবার ব্যয়ভার বহন করবে। একইভাবে পোর্ট সিটি মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বাবদ এস আলম গ্রুপ থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা নেবে না। আগামী ১৫ জুলাই এটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মেয়র জানান। এদিকে চট্টগ্রাম শহরে কয়েকটি আইসোলেশন সেন্টার চালু হলেও পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্সসহ লোকবলের অভাবে তা পরিপূর্ণভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা যায়।