করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে মুসলিমদের সর্বোচ্চ মহাসম্মিলন পবিত্র হজ এবার সীমিত পরিসরে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি আরব সরকার। সৌদির নাগরিক এবং দেশটিতে অবস্থানরত বিদেশি মিলে সর্বসাকুল্যে ১ হাজারের মতো মানুষ মহান আল্লাহর মেহমান হিসাবে এই হজ পালনের পরম সৌভাগ্য লাভ করবেন এ বছর। এবারের হজটি কার্যত প্রতীকী হতে যাচ্ছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনকে টেলিফোনে কোভিড-১৯-এর কারণে বিদেশিদের জন্য হজ বাতিলের বিষয়টি অবহিত করেছেন।
এর আগে গত সোমবার রাতে সৌদি আরবের এক রাষ্ট্রীয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের অব্যাহত বিস্তারের প্রেক্ষাপটে চলতি বছর খুবই সীমিত পরিসরে পবিত্র হজ পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। শুধু সৌদি আরবের নাগরিক এবং দেশটিতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকরা এই হজে অংশ গ্রহণ করতে পারবেন। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সৌদির ক্ষমতাসীন রাজপরিবার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার দেশটির হজবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ বেনতেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, মাত্র ১ হাজারের মতো মানুষ এবারের হজে অংশ নিতে পারবেন। এ বছর বিদেশ থেকে হজযাত্রীদের আগমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া হজে কারা অংশ নিতে পারবেন সে ব্যাপারে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সৌদি আরবের বাসিন্দাদের জন্যও যে হজ করার সুযোগ খুব একটা উন্মুক্ত থাকছে তা নয়। ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের কেউ হজে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন না।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী তৌফিক আল-রাবিয়াহ বলেন, হজ স্থাপনার সব কর্মীর করোনা পরীক্ষা এবং হজের সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। খবর আলজাজিরা, আরব নিউজ, খালিজ টাইমস, রয়টার্স, বিবিসি ও টুডে অনলাইনের।
প্রসঙ্গত, আধুনিক যুগের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো হজে বহির্বিশ্বের মুসলিমরা অংশ নিতে পারছেন না। ইসলামের ইতিহাসে অবশ্য হজ বাতিলের ঘটনা ঘটেছে কয়েক বার। সর্বশেষ প্রায় ২২২ বছর আগে ১৭৯৮ সালে একবার হজ স্থগিত করা হয়েছিল। প্রত্যেক বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ২৫ লক্ষাধিক মুসলিম পবিত্র হজ পালন করেন। এদের মধ্যে ১৮ লাখই সৌদির বাইরের। করোনায় সৌদিতে বর্তমানে ১ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি। প্রতীকী হজের কারণে ১২ বিলিয়ন ডলার আয় থেকে বঞ্চিত হবে সৌদি আরব। যা সৌদি আরবের মোট জিডিপির ৭ শতাংশ।
এদিকে বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বের মুসল্লিরা হজে যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। যদিও দুই সপ্তাহ পূর্বে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রুনাইসহ বহু দেশ হজযাত্রা বাতিল করেছে। তবে এবার বাংলাদেশ থেকে ৬৪ হাজার ৫৯৪ জন হজে যেতে আগ্রহী নিবন্ধন করে অপেক্ষায় ছিলেন। সৌদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে তাদের হজে যাওয়া হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের হজ এজেন্সিগুলো এবং হজযাত্রী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
নিবন্ধনকারীরা চাইলে টাকা ফেরত পাবেন
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিবন্ধনকৃতরা চাইলে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই তাদের টাকা তুলে নিতে পারবেন। যারা টাকা তুলবেন না, তারা আগামী বছর হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। যারা চাইবেন তারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিতে পারবেন। আজ বুধবার এ নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
৯৪৬ কোটি টাকা লোকসান গুনবে বিমান
বাংলাদেশ বিমানের আয়ের অন্যতম উত্স হজযাত্রী পরিবহন। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এবার ৯৪৬ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়বে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৯১ জনের হজে যাওয়ার কথা ছিল। যার মধ্যে ৬৮ হাজার ৫৯৫ জনকে বহন করত বিমান বাংলাদেশ। প্রতি টিকিট ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা হলে শুধু হজযাত্রী বহন করে ৯৪৬ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় হতো এই সংস্থার।
হজ-ট্রাভেল এজেন্সির বড় ক্ষতি
এবার হজ সীমিত করার ঘোষণায় হতাশ হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের হজ ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলো। প্রতি হজ মৌসুমে দেশে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এ বছর এই অঙ্ক শূন্যের কোঠায় থেকে যাচ্ছে। ফলে অনেক ট্রাভেল এজেন্সিকে প্রতিষ্ঠানে তালা দিতে হবে।
হজ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হজ ভিসা থেকে শুরু করে মক্কা-মদিনায় বাড়িভাড়া, গাড়িভাড়া, হজযাত্রীদের খাওয়াসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই আয় হতো তাদের। তবে হজ সীমিত করার সিদ্ধান্তে তারা এই আয় থেকে বঞ্চিত হবে।
হজ এজেন্সিস অব বাংলাদেশ (হাব) জানায়, তাদের বর্তমান সদস্য ১ হাজার ২৩৮ (এজেন্সি)। এজেন্সিগুলোর মালিকসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারের মতো। এছাড়া এ পেশার সঙ্গে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশে ও সৌদি আরবে আরো ১ লাখ লোক নিয়োজিত। সৌদির সিদ্ধান্ত এ বছর তাদের অনেক ভোগাবে বলে মনে করছে হাব।
আটাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল এইচ ভুঁইয়া বলেন, দেশে ৬০০ থেকে ৬৫০টি এজেন্সি সক্রিয়ভাবে হজযাত্রী বহন করে। প্রতিটি এজেন্সি থেকে কমপক্ষে ১০০ থেকে ৩০০ জন হজযাত্রীর টিকিট কাটা হতো। হজ সীমিতকরণের ঘোষণায় আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল।