করোনা মহামারীর মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত গঠিত সবচাইতে দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহেদিন (জেএমবি)। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারতে আটক হওয়া এই জঙ্গি সংগঠনের বেশ কয়েকজনকে আটকের পর এই তথ্য বের হয়ে আসে। বাংলাদেশে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনায় বড় রকমের ব্যর্থতার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলা ভাষা-ভাষীদের এলাকায় শুরু হয় জেএমবি’র সক্রিয়তা। বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, এই জঙ্গি গোষ্ঠী আবারো অর্থ সংগ্রহ শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে পূর্বের ন্যায় বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য ও মানবপাচার করেও অর্থ সংগ্রহ করছে জঙ্গি গোষ্ঠীটি।
সাউথ এশিয়ান টেরোরিস্ট পোর্টাল (এসএটিপি) তার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই জঙ্গি গোষ্ঠী কুয়েত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে। কুয়েতের রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ, দৌলায়াতুল কুয়েত, বাহারাইনের দৌলিয়াতুল বাহরাইন, আল ফুজিরা ও খাইরুল আনসার আল খাইরিয়া এবং সৌদি আরবের আল হারমাইন ইসলামিক ট্রাস্টের মত প্রতিষ্ঠানগুলো এই অর্থ সরবরাহ করছে।
সম্প্রতি আটক জেএমবি সদস্যরা দুই দেশে তাদের কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে। জুনের ১০ তারিখে ঢাকা থেকে র্যাব জেএমবির দুই সক্রিয় সদস্যকে আটক করে। আটককৃতদের মধ্যে পল্লবীর মো. রুহুল আমিন মল্লিক (৩৮) বিধ্বংসী কার্যক্রমের পরিকল্পনা করছিলো। একই দিন ভালুকা থেকে জেএমবি সদস্য মাঞ্জুরুল ইসলাম, রুহুল আমিন তালুকদার তৌফিক এবং আশরাফ খানকে আটক করা হয়। এর আগে মে মাসে ঢাকার কাকরাইল থেকে জেএমবির ১৭ সদস্যকে আটক করা হয় যারা বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে জিহাদে যোগ দিতে চাইছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল সাতক্ষিরা অথবা বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে ইন্দো-কাশ্মীর বর্ডারে যাওয়া। কিন্তু তারা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়। এরপর তারা সিলেট হয়ে ভারতে প্রবেশের পরিকল্পনা করে এবং সারা দেশ থেকে ঢাকায় এসে মিলিত হয়। এখানেই তারা আটক হয়।
বিভিন্ন দেশ থেকে জেএমবির জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজে জেএমবি প্রধান সালাহউদ্দিন সালেহিনের পক্ষে নিয়োজিত ছিলো ভারতে আটক হওয়া এই জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় সদস্য শেখ রেজাউল ওরফে কাজল। ২০২০ সালের মে মাসে আব্দুল করিম ওরফে বড় করিমকে মুর্শিদাবাদ পুলিশ আটক করে। করিম বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা এবং মুর্শিদাবাদ এলাকার সর্বোচ্চ নেতা বলে মনে করা হচ্ছে। সালাহউদ্দিন সালেহিনের মতো সর্বোচ্চ নেতাদের জন্য সাহায্য ও সহযোগিতা পৌঁছে দেয়ার কাজে সে নিয়োজিত ছিলো। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ভারতে হওয়া বিভিন্ন জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে উভয় দেশে আটক আদেশ রয়েছে। করিম নব্য জেএমবির নেতৃত্বের একজন যারা দাবি করেন যে, তাদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস)। বরং ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মনে করে ২০১৩ সালে বোধ গায়া বোমা হামলায় সে সম্পৃক্ত রয়েছে। রেজাউল ও আব্দুলকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অভিবাসী শ্রমিক সেজে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে জেএমবি প্রধান সালাহউদ্দিন ও তার সহযোগী মিন্টু খান। এই জঙ্গিদের খুঁজে পেতে র্যাব ও কলকাতার এসটিএফ একত্রে কাজ করে যাচ্ছে।
এই জেএমবি ও নব্য জেএমবি গোষ্ঠীর নারী সদস্য ও পৃথক সংগঠন রয়েছে যারা সন্ত্রাসী তৎপরতায় সহায়তা করছে। ৪ ফেব্রুয়ারি সিটিটিসি আসমানি খাতুন ওরফে আসমাকে যে বন্দী জীবন ও নিখোঁজ আলো নামেও পরিচিত তাকে আটক করে। সে নারী সংগঠনের প্রধান। নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে বাংলাদেশ বেশ কিছু বোমা হামলার ঘটনার জন্য তিনি দায়ী। চট্টগ্রামে এক ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩ পুলিশ সদস্য আহত হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা ও অন্য আরো তিন স্থানে পুলিশের ওপর হামলা এবং পাঁচ স্থানে বিস্ফোরক (আইইডি) রাখার পর ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী নব্য জেএমবির একটি সেলকে আটক করতে সক্ষম হয়।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান হয় যার নাম ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ’ বা জেএমজেবি। ২০০৪ সালে এই সংগঠন নিজেদের নাম পরিবর্তন করে রাখে জামাতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এই জঙ্গি গোষ্ঠী পরিচিতি লাভ করে ২০০৫ সালে একযোগে দেশের ৬৩ জেলায় বোমা হামলার মাধ্যমে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ জেএমবির দুই জঙ্গি সিদ্দিকুল ইসলাম এবং শেখ আব্দুর রহমানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। কিন্তু পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় সালাহউদ্দিন সালেহিন। পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামিক শাসন কায়েমের স্বপ্ন থেকে ভারতে জেএমবির অংশ সৃষ্টি করে সালাহউদ্দিন যার নাম জামাতুল মুজাহেদিন ইন্ডিয়া (জেএমআই)। ২০১৯ সালের মে মাসে জঙ্গি তৎপরতার জন্য ভারতে জেএমআইকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
বারবার জেএমবিকে তার কার্যক্রম ও সংগঠিত হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর চেষ্টার পরও আবারো সংগঠিত হতে ও সক্রিয় হতে কাজ করে যাচ্ছে জেএমবি ও নব্য জেএমবির সদস্যরা। বাংলাদেশে জঙ্গি হামলা চালাতে রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষণ দিতে জেএমবিকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ব্যবহার করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ভারতে থেকে জেএমবির ৩০০ জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ধারণা করছে। ইন্ডিয়া টাইমস ও দ্যা ডিপলোমেট।
ইত্তেফাক/আরএ