জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বয়ের গুরুত্ব

ভারী বর্ষণের ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া ঢাকায় নূতন কিছু নহে। বর্ষাকাল আসিলেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, কিছুটা সময় থাকিয়া আবার চলিয়া যায়। কোনো কোনো এলাকায় অল্প সময় এবং কোনো এলাকায় লম্বা ভোগান্তি সৃষ্টি করিয়া থাকে। তবে জলাবদ্ধতা যতটা সময়ই থাকুক না কেন, ঐ সকল এলাকার জনজীবন নরকে পরিণত করিয়া যায়। উদ্বেগের বিষয় হইল, ইহার প্রকোপ প্রতি বত্সরই বাড়িতেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউটস অব প্ল্যানার্স জানাইয়াছে, এই বত্সর অর্ধশতাধিক এলাকায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রহিয়াছে। ইহার মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০টি এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে ২৯টি এলাকা রহিয়াছে।

কোনো শহর পরিকল্পিত হইলে সাধারণত তাহা জলাবদ্ধতার শিকার হয় না। নিউ ইয়র্ক শহরে যখন সুরকির রাস্তা ছিল এবং সেই রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি চলিত, তখনো সড়কের পার্শ্বে কতটা পেইভমেন্ট এবং কতটা স্যুয়ারেজ লাইন থাকিবে তাহা পূর্বেই নির্ধারণ করা ছিল। সরকার ও জনগণ তাহা অনুসরণ করিয়া চলিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের আধুনিক সময়ের ঢাকা গড়িয়া উঠিবার জন্য কেহ নগর পরিকল্পনার ধার ধারেন নাই। সুতরাং অতিবৃষ্টি, বৈশ্বিক উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা—এই সকল কারণ বাংলাদেশের মতো সমতল ও নদীমাতৃক দেশের অপরিকল্পিত শহরে জলাবদ্ধতা বাড়াইবেই। শুধু তাহাই নহে, ভবিষ্যতে শহর পরিত্যক্ত ঘোষণার পর্যায়েও যাইতে পারে। ইহার পরও সরকার টেকসই সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিয়াছে অথবা গ্রহণ করিয়াছে—তাহা মনে হয় না। বিগত বত্সর ঠিক এই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মহোদয় বলিয়াছিলেন, এই দুর্ভোগ হইতে রাতারাতি মুক্তি সম্ভব নহে। কারণ বিগত ৪০-৫০ বত্সর ধরিয়া এই শহরকে দূষিত করা হইয়াছে। প্রশ্ন রাখিলে অযৌক্তিক হইবে না যে, মন্ত্রী মহোদয় এই দূষণ বলিতে কী বুঝাইয়াছেন? তাহা কি শুধুই পরিত্যক্ত পলিথিনসহ নানাবিধ বর্জ্য? নাকি এই দূষণ আরো জটিল, যাহা কেবল বুলডোজার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কর্ম নহে!

তবে ইহাও সত্য যে, পানি নিষ্কাশনের পথগুলি আবর্জনায় ভরিয়া থাকা, খাল ও জলার মুখগুলি ময়লা আবর্জনায় অচল হইয়া যাওয়া, অবৈধ দখলের কারণে কঠিন বর্জ্যে আটকাইয়া যাওয়া এবং নগরের ড্রেন, বক্স কালভার্ট এবং ব্রিক স্যুয়ারেজ লাইন দিয়া পানি নদীতে প্রবেশ করিতে না পারা এই জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। ইহার সহিত অধুনা মেট্রোরেল নির্মাণ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিআরটিএ প্রকল্পের উন্নয়নকাজের কারণে আরো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে। আমরা মনে করি, শুধু মিটিং আর নির্দেশনায় আটকাইয়া না থাকিয়া সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগকে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখাইতে হইবে। কারণ ব্রিজ, বক্স কালভার্ট হইতে শুরু করিয়া খাল ও বিভিন্ন প্রকল্পের কর্ম ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার হাতে রহিয়াছে। ভালো করিবার জন্য একে অপরের কাজে হাত দিতে পারে না, তাহা যত কল্যাণকরই হউক। সুতরাং সমন্বয়ের বিকল্প নাই। সমন্বয়ের মধ্যে যৌথভাবে কাজ শুরু করিলে দ্রুত ফল মিলিবে বলিয়া ধারণা করা যায়।