ভারত-চীনের সংঘাত নয় শান্তি চাই

তাহিন আক্তার

বিশ্বের প্রভাবশালী দুই দেশ ভারত ও চীন। দেশ দুটি সামরিক শক্তিতেও বিশ্বের অন্যতম। কাশ্মীরের লাদাখ অঞ্চলের সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে এই দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। সম্প্রতি এই দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে এই দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ কোনো নতুন বিষয় নয়। অনেক আগে থেকেই উভয় দেশের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে থাকে। সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালে ভুটানের সীমান্তে দোকলাম নামক স্থানে চীনের রাস্তা তৈরি নিয়ে চীন ও ভারতের সেনাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়েছিল। সর্বশেষ ১৫ জুন সংঘাতের ঘটনায় চীন দাবি করেছে, ভারত লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা মানছে না। চীনের এলাকায় ঢুকে পড়ছে বারবার। তারা সেনা প্রটোকল ভেঙে চীনা ভূখণ্ডে ঢুকে তাদের টেন্ট ভাঙার চেষ্টা করেছে। ঠিক এর উলটো দাবি করেছে ভারত। তারা বলছে, চীনের পক্ষ থেকে বিনা উসকানিতে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার উদ্দেশ্য নিয়েই অনুপ্রবেশ করা হয়। এরপর উত্তেজনা শুরু হয়।

গত ২০ বছর ধরে ভারত-চীন শুধু নিজেরাই সমরাস্ত্র তৈরি করেনি, একই সঙ্গে অস্ত্র আমদানিও করেছে। ভারত টানা পাঁচ বছর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে নাম লেখিয়েছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও রাশিয়া থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র আমদানি করেছে। পাশাপাশি নিজেরাও অস্ত্র তৈরি করেছে। আবার চীনও কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই। তারাও রাশিয়া থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনেছে। বর্তমানে তারা বেশির ভাগ অস্ত্র নিজেরা উত্পাদন করছে। সব মিলিয়ে ভূ-রাজনৈতিক কারণে চীন এখন সরাসরি কাশ্মীর বিতর্কে প্রবেশ করতে চাইছে, যার প্রথম ধাপ গালওয়ান ভ্যালি কবজা করার চেষ্টা করা। তবে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট যে, অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মনে করে চীনকে শায়েস্তা করার জন্য যে দেশটি তাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারে—সেটি হলো ভারত। আর এ কারণে ভারতকে সব সময় পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্র।

গ্লোবাল টাইমসে লেখা চীনা বিশ্লেষক লং শিং চুং দাবি করেছেন, ‘ভারত সরকার যেন তাদের দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কামানের গোলা হিসেবে ব্যবহূত না হতে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে দুই দেশকেই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, যে কোনো সুযোগেই শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নষ্ট করা যুক্তরাষ্ট্রের স্বভাব।’ এই ব্যাখা থেকে বোঝা যাচ্ছে, চীন কখনো যুক্তরাষ্ট্রের খবরদারি মেনে নেবে না। তবে এখন আন্তর্জাতিক মহল বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে—সেই দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। ইতিমধ্যে চীনের চির শত্রু যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে পজিটিভ ইঙ্গিত দিয়েছে। এখন বাকি বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, ভারত শান্তি বজায় রাখতে চায়, কিন্তু প্ররোচনা দিলে তার জবাব দিতেও তারা তৈরি আছে।

তবে করোনা ভাইরাসের কারণে ভারত আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। বর্তমান সময়ে ক্রমেই সংক্রমণের হার বাড়ছে; যা দেশটির জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ওপর চরম হুমকি। ঠিক এই বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে চীনের আগ্রাসি মনোভাবে চাপে পড়েছে মোদি সরকার। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সংঘাতে ভারতীয় সেনাদের প্রাণহানির পর ব্যাপক অস্বস্তিতে পড়েছে দেশটি। শুধু চীন নয় বরং পাকিস্তান ও নেপালের ত্রিমুখী সামরিক চাপে পড়তে পারে ভারত। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও এখন করোনায় নাস্তানাবুদ। ঠিক এই সময়টাতে এসে চীন ‘ঝিকে মেরে বউকে বোঝানো’র চেষ্টা করছে।

তবে সীমান্ত বিরোধের ফলে চীনবিরোধীদের অনেকেই এখন ভারতের দিকে ঝুঁকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চীনবিরোধী (ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) বলয় গড়ে উঠতে পারে। চীনও দক্ষিণ এশিয়ায় তার স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতি ক্রমেই জোরালো করে যাচ্ছে। বেশ কিছু দিন ধরে বিশ্বে নিজেদের প্রভাব বলয় বিস্তারের চেষ্টা করছে চীন। এখন দুই দেশের উচিত, তাদের সীমান্তবিরোধ নিয়ে একটি কূটনৈতিক সমাধান করে ফেলা। কারণ, অস্থিরতা যত বাড়বে, তাতে বিশ্বের অনেক দেশই অনেক ধরনের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে গোটা উপমহাদেশ হুমকির মধ্যে পড়বে। বিশেষ করে বাংলাদেশ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য আমরা ভারত-চীনের মধ্যে সংঘাত নয়, শান্তি চাই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়