অজিত মনি দাস
যে শব্দটার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে প্রতিটি পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যের নিরাপত্তাকে ঘিরে, সেই সামাজিক ব্যাধির নাম ধর্ষণ। ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার নির্মম খবর প্রত্যেক নারীর স্বাধীন চলাফেরায় দেওয়াল সৃষ্টির কারণ। পুলিশ পরিসংখ্যান হিসাবে, ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৩ হাজার ৯০০ নারী এবং ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪০০ জনে। শিশু ধর্ষণের ঘটনাও বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের প্রতিবেদনেও ধর্ষণের আলাদা আলাদা পরিসংখ্যান উঠে আসে। সত্যিকার অর্থে, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয় অসম্ভব না হলেও অন্ধকারে হাঁটার মতো। ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের মতো নিন্দনীয় ঘটনা বেড়ে তিন থেকে চার গুণ হয়েছে আন্দাজ করলেও ভুল হবে না। করোনাকালীন নরপিশাচদের আক্রোশ থেকে রেহাই পাচ্ছে না হাজারো নারী এমনকি কোমলমতি শিশুরাও। উঠে আসছে বিভিন্ন নির্মম ঘটনা। বাগেরহাটে প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণ, চকোলেটের লোভ দেখিয়ে চাচার বিরুদ্ধে সাত বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগ-ঘটনা মাদারীপুরে রাজৈর উপজেলায়, ভাইয়ের পাশেই বোনকে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ, বনভোজনের কথা বলে ধর্ষণ ঘটনা এমনকি গণধর্ষণের মতো বহু ঘটনা। জাতি হিসেবে কি অসভ্য হয়ে যাচ্ছি আমরা? ২০২০ সালের মাঝামাঝিতেই যা প্রায় ২৫০ ধর্ষণের ঘটনা নজরে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এবং অনেক ঘটনা হয়তো এখনো সমাজের আড়ালেই লুকায়িত রয়ে গেছে। ধর্ষণ নামক অভিশাপ সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব না হলেও জঘন্যতম অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
আপনার নজরে আসবে, সমাজের কিছু সমালোচক ব্যক্তি ভিন্নমত পোষণ করবেই। ধর্ষণের কারণ হিসেবে দায়ী করবে নারীদের বেপরোয়া, বেপর্দায় ঘোরাফেরাকে। সেই সব ভিন্নমত মানুষের কাছে প্রশ্ন, তাহলে শিশু ধর্ষণ কেন হয়? ধর্ষকের সামনে একটা বাক্য ছুড়ে দিতে চাই, নারীকে ভোগের উপকরণ না ভেবে দৃষ্টিভঙ্গি পালটান। যে এলাকা বা মহল্লায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে, ঐ এলাকার জনগণকেই প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করতে হবে। নচেত্, একটি ধর্ষণের ঘটনা আরো বহু ধর্ষণের ঘটনার জন্ম দিবে। করোনা গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিতে পারলেও, অর্থনীতিকে টালমাটাল করতে পারলেও, মৃত্যুপুরীতে পরিণত করতে পারলেও, ধর্ষকের মনে জঘন্য হিংস্রভাবকে দমাতে কেন অপারগ? ধর্ষণের কারণ উদ্ঘাটনে কয়েকটি বিষয় বেশি নজরে আসে : কিশোর ও যুবকদের পর্নোগ্রাফিতে অধিক আকৃষ্ট থাকা, খারাপ সঙ্গদোষ ও নেশায় আসক্ত থাকা, ছোটো ছোটো অপরাধ পরিবারের নজর না দেওয়া। কিন্তু ছোটো ছোটো অপরাধই তো বড়ো অপরাধের জন্ম দেয়। ফলশ্রুতিতে সমাজ অশ্লীলতা ও অপরাধ কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। পরদিন ধর্ষণ, গণধর্ষণের মতো ঘটনা পুনরুত্থান ঘটছে। এভাবে চক্রাকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে জঘন্যতম অপরাধ ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা, এমনকি বৈবাহিক ধর্ষণও। ধর্ষক নামের নরকের কিট যাতে এরূপ অপরাধ থেকে পিছিয়ে আসে, সেজন্য সচেতন হতে হবে প্রতিটি পরিবারকে, প্রতিবেশীদের, বন্ধু-বান্ধবসহ প্রশাসনকেও। মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছু উক্তি, আপনার আশেপাশে হয়তো কোনো নরপিশাচ ফাঁদ পেতে আছে, সুযোগের অপেক্ষায় আছে। কোনো অপরাধের গন্ধ পেলে পরিবারকে জানান, দরকার হলে প্রশাসনকে অবহিত করুন। আপনজন ও কাছের কেউ হলেও ধর্ষণ ও আপনার সম্মান নিয়ে খেলার অধিকার তার নেই। মুখ বুঝে কোনো কিছু সহ্য করার দিন আর নেই, প্রতিবাদী হয়ে উঠুন। কোনো কিছু হওয়ার আগেই রুখে দাঁড়ান, আপনাকে দেখে হাজারো মেয়ে সাহস পাবে। ধর্ষণ ঠেকাতে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিবাদী হওয়া খুবই প্রয়োজন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়