চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা

চট্টগ্রামে গতকাল বুধবার ভোররাত থেকে হালকা থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে। বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাহাড় ধসের আশঙ্কা করছেন আবহাওয়া অফিস। জেলা প্রশাসনের পক্ষে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে গিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান গ্রহণের জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নগরীতে ১৭টি পাহাড়ে ৮৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করবে বলে জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এদিকে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ স্বাক্ষরিত এক বুলেটিনে বলেছেন, সক্রিয় মৌসুমী বায়ু ও বঙ্গোপসাগরে গভীর সঞ্চালনশীল মেঘের কারণে ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী বর্ষণের মাত্রা হতে পারে ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার। ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামে পাহাড় ধস হতে পারে।’

চট্টগ্রামের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. দেলোয়ার              হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে গিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানের জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। আমরা দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব। নগরীতে কয়েকটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে অবস্থানকারীদের সরকারিভাবে খাবার বিতরণ করা হবে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা এলাকায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।’

প্রতি বছর বর্ষা আসলেই পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের নিয়ে প্রশাসনের তোড়জোড় শুরু হয়। কয়েকটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে দায়িত্ব শেষ করেন প্রশাসন। বৃষ্টি থেমে গেলে প্রশাসনের উচ্ছেদ কার্যক্রমও বন্ধ থাকে।  সারাবছর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চাপা পড়ে থাকে। দিনে সরিয়ে দিলে রাতে পুনরায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ফিরে যাচ্ছে বসবাসকারীরা। অবৈধ বসতিগুলোর পিছনে পাহাড় দখলে রাখা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইন্ধন রয়েছে। পাহাড় রক্ষায় ইতিপূর্বে গঠিত সরকারি কমিটির সুপারিশ এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড়গুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বেড়েই চলেছে।

চট্টগ্রামে কয়টি পাহাড়, কয়টি বসতি ঝুঁকিপূর্ণ, কয়জন অবৈধ দখলদার এবং কারা এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সব কিছুর তালিকা প্রশাসনের কাছে রয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত বসতিগুলোর মধ্যে অসংখ্য বসতি দ্বিতল ও ত্রিতল বিশিষ্ট পাকা ভবনও রয়েছে। এসব ভবনে রয়েছে বৈধ বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির সংযোগ। জেলা প্রশাসন ইতিপূর্বে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে একাধিকবার সিদ্ধান্ত নিলেও তা সব জায়গায়  কার্যকর হয়নি। অভিযোগ রয়েছে পাহাড়ে অবৈধ বসতিগুলোর পিছনের প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ থাকায় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। সরকারি কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, নগরীর বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, কাট্টলী ও চান্দগাঁও ভূমি সার্কেল এলাকার মধ্যে পাহাড় রয়েছে। সুপারিশগুলো উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। সব সুপারিশ এক সঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পাহাড়ের মালিকানা নিয়ে মামলা রয়েছে। এখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ও রয়েছে। কমিটির অনেকগুলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে বলে জানান তিনি।

গত ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে ভয়াবহ পাহাড় ধসে ১২৭ জন নারী, পুরুষ ও শিশু মারা যায়। এরপর পাহাড়ে অবৈধ বসতি নিয়ে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট ১১ জন, ২০১১ সালের জুলাইয়ে দুই দফায় ১৯ জন এবং ২০১২ সালে ১২ জন পাহাড় ধসে মারা যায়। ২০০৭ পাহাড় ধসের পর সরকারিভাবে গঠিত কমিটি ২৮টি কারণ চিহ্নিত করে এবং ৩৬টি সুপারিশ করেন। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগ অতিবাহিত হলেও কমিটির সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের পুনর্বাসন ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে ছিল পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, মামলা দায়ের, পাহাড় ব্যবহারে নীতিমালা প্রণয়ন, নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ, বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ, পাহাড়ের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা তৈরির অনুমোদন না দেওয়া, পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প গ্রহণের অনুমোদন না দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করে সামাজিক বনায়ন করা।