প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস শুধু মানুষের পেশাগত, ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনযাত্রাই ওলটপালট করে দেয়নি; বদলে দিয়েছে দেশের রাজনীতির চিরাচরিত দৃশ্যপটও। বলতে গেলে করোনা রাজনীতিকে পথ-ঘাট ও দলীয় কার্যালয় থেকে তুলে নিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সব দলেরই কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে দেশব্যাপী থাকা বিভিন্ন স্তরের কার্যালয়গুলো অঘোষিত লকডাউনে ও নেতাকর্মীশূন্য প্রায়। করোনা-আতঙ্কে রাজনৈতিক দলগুলোর সীমিত কার্যক্রম চলছে প্রযুক্তির সহযোগিতায়। রাজনীতি এখন পুরোপুরি ভিডিওবার্তা, ভিডিও কনফারেন্স, ই-মেইল, ফোন, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবার-নির্ভর হয়ে পড়েছে। তবে ভার্চুয়াল রাজনীতির মধ্যেও করোনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বাহাস চলছে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দলের নেতাদের।
করোনার থাবা বদলে দিয়েছে রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চিরচেনা সংবাদ সম্মেলনের ধরনও। কোনো কোনো দল সংগঠনের জরুরি সভা করছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বা ভিডিও কনফারেন্সে। দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন ভিডিওবার্তায়। গণমাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিবৃতি পাঠাচ্ছেন ইমেইলে, হোয়াটসঅ্যাপে কিংবা ইমোতে। আর দলের নেতারা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন ফোন, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবারে।
বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায় প্রতিদিনই বক্তব্য রাখছেন ভার্চুয়ালি। সরকারি বাড়ি থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই বক্তব্য পৌঁছে যাচ্ছে অন্যান্য গণমাধ্যমে। আওয়ামী লীগের আরো কয়েকজন নেতাও নিয়মিত বক্তব্য তুলে ধরছেন প্রযুক্তির মাধ্যমে। একইভাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও নিয়মিত বক্তব্য তুলে ধরছেন ভার্চুয়ালি। দল দুটির নেতারা নিজেদের বক্তব্যে প্রতিপক্ষের বিভিন্ন বক্তব্য-মন্তব্যের জবাবও দিচ্ছেন। এক দল আরেক দলের সমালোচনাও করছেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বৃহস্পতিবারও নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের বিরুদ্ধে বিরাজনীতিকরণের যে অভিযোগ তুলেছেন, তা নাকচ করেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, করোনার এ সংকটকালে সরকার ও আওয়ামী লীগ কোনো রাজনীতি করছে না। এখন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জনগণকে করোনামুক্ত রাখাই আমাদের রাজনীতি। আগের দিন মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, ‘সরকারের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে’। তার এই মন্তব্যের প্রতিবাদে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে নেতিবাচক ও অন্ধ সমালোচনানির্ভর রাজনীতির জন্য বিএনপিরই পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করা ছাড়া বিএনপির এখন আর কোনো রাজনীতি নেই। অসহায় মানুষ থেকে তাদের অবস্থান এখন যোজন-যোজন দূরে।’
গতকাল এক ভার্চুয়াল আয়োজনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, করোনা ভাইরাস সংকটের মধ্যে জনগণের ওপর চাপ দিয়ে সরকার কর আদায় করছে। এখন এই দুঃসময়ে ইলেক্ট্রিক বিল, ইনকাম ট্যাক্স, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স, মিউনিসিপ্যাল ট্যাক্স ও অন্য যেসব ট্যাক্স আছে তা আপাতত বন্ধ করা উচিত। তিনি এ-ও বলেন, এই সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নয়। এই ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করা একমাত্র একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পক্ষেই সম্ভব। ফখরুল তার উত্তরার বাসা থেকে বিএনপির ‘জাতীয় করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সেল’-এর ত্রাণ বিতরণ কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন।
শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপিই নয়; অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সীমিত কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া গতকাল ইমেইলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যুক্ত বিবৃতিতে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি রোধে সত্-দক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। করোনা ভাইরাস মহামারিতে দেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, করোনা আক্রান্তদের পরীক্ষার জন্য ল্যাব, অক্সিজেন, ভেন্টিলেটরসহ হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে হবে।
জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের বুধবার এক ভিভিওবার্তায় নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। এতে তিনি বলেছেন, করোনা সংক্রমণ যে হারে বেড়েছে সেই হারে টেস্টিং বাড়েনি।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। এতে দলটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের বক্তব্য হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কাছে পাঠাচ্ছেন জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। বুধবারও হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এক বিবৃতিতে রব বলেছেন, করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সরকার দেশবাসীকে ভুল তথ্য দিচ্ছে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও নিজের বিভিন্ন বক্তব্য ও দলীয় বিবৃতি পাঠাচ্ছেন ইমেইলে। জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাম গণতান্ত্রিক জোট, শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদও বিভিন্ন ইস্যুতে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠাচ্ছেন ইমেইলে।