মানুষ কোথায় যাইবে, জীবিকার কী হইবে?

আমাদের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। এই বত্সর তাত্পর্যপূর্ণভাবে ঐ দিন হইতেই শুরু হইয়াছিল সাধারণ ছুটি। তবে এই ছুটি আক্ষরিক অর্থে ‘সাধারণ’ ছিল না। করোনা-পরিস্থিতি সামলাইতে বিভিন্ন ধাপে এই ছুটি বৃদ্ধি করা হয় ৬৬ দিন অবধি। তাহাতে করোনাকে অবশ্য খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় নাই। কিন্তু ঐ ছুটির ভিতরেই কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর ভয়াবহ অন্ধকার নামিয়া আসিয়াছে। এই ছুটির কারণে বহুমাত্রিক ক্ষতির সম্মুখীন হইয়াছে অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়— বিশেষ করিয়া ফেরি, হকার, ভ্যানে পণ্য বিক্রয়, চা-পান-সিগারেট বিক্রয়, ক্ষুদ্র দোকান, মুদি দোকান, ক্ষুদ্র হোটেল-রেস্তোরাঁ, মাঝারি পাইকারি ব্যবসায়। সমগ্র দেশে এই ধরনের ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৮৬ লক্ষের উপরে। আর তাহাদের উপর নির্ভরশীল ৭ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের খাওয়া-পরা। এই সংখ্যাটি দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ। ইহার অর্থ হইল, দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ করোনার কারণে এক কঠিন অনিশ্চিত জীবনের অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। বলা যায়, ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে সমাজের শ্রেণিকাঠামোতেও পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে।

ঢাকায় এই চিত্র সবচাইতে বেশি স্পষ্ট। করোনার জন্য দেওয়া সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের কারণে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস অধিকাংশ পেশাজীবীর নাই এক টাকাও আয়। জমানো টাকাও শেষ হইয়া গিয়াছে অধিকাংশ মানুষের। আয় না থাকিবার কারণে ঢাকায় পরিবার নির্বাহের খরচ ও বাসাভাড়া দিতে না পারায় চলতি মাসের শুরুর দিকে বহু মানুষ তাহার পরিবার পাঠাইয়া দিয়াছেন গ্রামের বাড়িতে। ভাড়াবাসাও ছাড়িয়া উঠিয়াছেন মেসে। অনেকে সপরিবারে ঢাকা ছাড়িয়াছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির একটি জরিপ হইতে জানা যায়, করোনার কারণে দেশের প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ কাজ হারাইয়াছেন। আগে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৪০ লক্ষ। করোনার কারণে ‘নবদরিদ্র’ হইয়া মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে ৬ কোটি ৮০ লক্ষে। ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের একটি বেসরকারি সংগঠন জানাইয়াছে, ঢাকায় ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার লোক বাসা ছাড়িয়া দিয়াছে। এখন প্রশ্ন হইল, মানুষ যাইবে কোথায়?

একটু ভালো করিয়া বাঁচিবার আশায় লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে স্বাধীনতার পর হইতে। তাহাদের মধ্যে শিক্ষা-কর্মজীবনের প্রয়োজনে অনেকে যেমন ঢাকায় স্থায়ী হইয়াছেন, তেমনি নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়া ভাসমান মানুষও ঢাকায় আশ্রয় লইয়াছেন। এখন এই দুর্যোগকালে যাহাদের কোথাও যাইবার জায়গা নাই, তাহারা যাইবেন কোথায়? যাহাদের কোথাও কোনো কাজ নাই, তাহারা কী করিয়া অন্নক্ষুধা মিটাইবেন? তাহাদের সংখ্যা বিপুল। তাহাদের ত্রাণ দেওয়া সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র, স্থায়ী সমাধান নহে। করোনার পূর্বে বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু না কিছু করিয়া খাইত-পরিত। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হইয়াছে বলিয়াই তাহারা অথই সাগরে পড়িয়াছে। সুতরাং অর্থনীতির চাকা ঠিকমতো চালু করা সম্ভব হইলেই এই সমস্যার সমাধান হইবে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দায় আমাদের চাকা কী করিয়া যথাসম্ভব সচল রাখা যায়—তাহাই এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়।