সময় কত দ্রুত পালটাইয়া যায়! কয়েক মাস পূর্বে করোনা সংক্রমণ যখন ইউরোপকে দিশেহারা করিয়া দিয়াছিল তখন আমেরিকায় করোনার সুনামি সতর্কতা জারি হইয়াছে মাত্র। আমেরিকা ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া বলিয়াছিল, ইউরোপের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে করোনা ভাইরাস ঢুকিয়া পড়িয়াছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আপাতত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির দরজা বন্ধ। কী অদ্ভুত ট্র্যাজেডি, আমেরিকায় এখনো করোনার সুনামি অব্যাহত রহিয়াছে আর লকডাউনের ধাপ পার হইয়া ক্রমশ স্বাভাবিক হইতেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি! খুলিতে যাইতেছে তাহাদের সীমান্তও। আর এই ক্ষেত্রে পহেলা জুলাই হইতে অন্যান্য দেশের সহিত সীমান্ত খুলিবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত লইতে বুধবার বৈঠকে বসিয়াছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রনেতারা। সেইখানে সিদ্ধান্ত হইয়াছে, ইউরোপের বাহিরের দেশগুলির জন্য তৈরি হইবে একটি নিরাপদ তালিকা। আর সেই নিরাপদ তালিকা হইতে যেই সকল গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাদ পড়িবার কথা জানা গিয়াছে, তাহাদের মধ্যে রহিয়াছে আমেরিকা, ব্রাজিল ও রাশিয়ার মতো দেশ।
ট্রাম্প যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলির জন্য আমেরিকার সীমান্ত বন্ধ রাখিবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিয়াছিলেন তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাহার কড়া সমালোচনা করিয়াছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন পালটা এমন সিদ্ধান্ত লইলে তাহার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প কী বলেন, তাহা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন লইয়া ট্রাম্প প্রবল চাপে রহিয়াছেন। এই চাপ বহু গুণ বাড়াইয়া দিয়াছে করোনা ভাইরাস। আমেরিকায় এই মুহূর্তে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ লক্ষ ছাড়াইয়াছে। মৃতের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৬ হাজারেরও বেশি। এই পরিস্থিতিতে দেশটির জনস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধান রবার্ট রেডফিল্ড মার্কিন কংগ্রেসে বলিয়াছেন, করোনা সংক্রমণ রুখিতে আমাদের যাহা যাহা করা সম্ভব ছিল, আমরা করিয়াছি, কিন্তু এই একটা ভাইরাস আমাদের মাটিতে মিশাইয়া দিয়াছে।
আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা যখন মনে করেন করোনা ভাইরাস তাহাদের মাটির সহিত মিশাইয়া দিয়াছে, তখন আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির অবস্থা কী ভয়াবহ হইতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই করোনা সংক্রমণ এখনো শিখরে পৌঁছায় নাই। যেই সকল দেশে করোনা শিখরে পৌঁছাইয়াছে বলিয়া মনে করা হইতেছে, সেইখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসিবার আশঙ্কা করা হইতেছে। সুতরাং এই বিশ্ব খুব সহজে আগের মতো স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিতে পারিবে না। বিশেষ কিছু স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানিয়া এই বিশ্ব ‘নিউ নরমাল’ নামে নূতনভাবে স্বাভাবিক হইতে চেষ্টা করিতেছে, তবে ভ্যাকসিন না আসা অবধি স্বস্তি নাই। কিন্তু, একটি কার্যকর ভ্যাকসিন পাইতে বিশ্ববাসীকে গড়ে অপেক্ষা করিতে হয় প্রায় ১১ বত্সর এবং সফলতার হারও মাত্র ৬ শতাংশ। আপাতত স্বস্তির কথা হইল, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ঔষধ উত্পাদনকারী অ্যাস্ট্রাজেনেকার পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন প্রথম ভ্যাকসিন হিসাবে চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাইয়াছে। অক্সফোর্ড ছাড়াও এখন পর্যন্ত ১৩টি ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা পর্যায়ে রহিয়াছে। প্রি-ক্লিনিক্যাল বিবর্তন পর্যায়ে রহিয়াছে আরো ১২৯টি ভ্যাকসিন। তবে কতখানি ক্ষতিসাধনের পর করোনা স্তিমিত হইবে কিংবা কার্যকর ভ্যাকসিন আসিবে—তাহা কেহই বলিতে পারে না। বর্তমানে অপেক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা ছাড়া উপায় নাই।