সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক সামনে আরো বড় সংকট

দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকা ব্রিটিশ সরকারের একটি গোমর ফাঁক করে দিয়েছে। পত্রিকাটি তদন্ত করে দেখেছে, ব্রিটেনে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতদের সংখ্যা সম্পর্কে সরকারিভাবে যা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। এই সংখ্যা বহুগুণ বেশি। একই অভিযোগ আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত ও মৃতদের সংখ্যা সম্পর্কে উঠেছে। অভিযোগ, সংখ্যা কম দেখানো হচ্ছে।

বাংলাদেশেও এই সংখ্যা কম দেখানো হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এই প্রশ্নের জবাবে বলা যেতে পারে, সরকার ইচ্ছা করে সংখ্যা কম দেখাবে তা মনে হয় না। ব্রিটেন ও আমেরিকায় এই সংখ্যা কম দেখানোর কারণ আছে। দুই দেশের সরকারই করোনা আবির্ভাবের প্রথম দিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য দেখিয়েছিল। পরে করোনা ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশেরই সরকার বিপাকে পড়ে। দেশের মানুষের সর্বস্তরের যে সমালোচনা দেখা দিয়েছিল এবং এখনো যে সমালোচনা চলছে, তা সামাল দেওয়ার জন্য সরকার আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে পারে। কেউ কেউ বলেন, আক্রান্ত ও মৃতের আসল সংখ্যা প্রকাশিত হলে জনমনে আতঙ্ক দেখা দেবে এই ভয়ে কোনো দেশের সরকারই আসল সংখ্যা জানাচ্ছে না।

বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করায় লাভ নেই। এটা এখন সবার জানা। বাংলাদেশে করোনা হামলা এখন দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। বেড়ে চলেছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও। রোগ শনাক্তও হচ্ছে অসংখ্য মানুষের মধ্যে। এখানে ধামাচাপা দেওয়ায় লাভ নেই। বাংলাদেশে একটাই আশার আলো, করোনায় যত লোক মারা যাচ্ছে, তার বহুগুণ বেশি আক্রান্ত রোগী ভালো হয়ে বাড়িতে ফিরছে। তবে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের যে সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে ভুল ধরা পড়লে বুঝতে হবে এই সংখ্যা নির্ধারণে সরকারের যে বিভাগ কাজ করছে, তাদের দক্ষতা অথবা জনশক্তি কম। তারা সারাদেশের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে পারছে না। যেমন পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ সালের নভেম্বর মাসের গর্কিতে সরকার প্রথমে ঘোষণা করেছিল মৃতের সংখ্যা দুই। দিন গত না হতেই একই সরকারি ঘোষণায় বলা হয় মৃতের সংখ্যা এক রাতেই ১০ লাখ। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এমন ভুল অবশ্যই করবে না। তবে সামান্য ভুলভ্রান্তি অবশ্যই হতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এখনো দেশটাতে অগম্য বহু হাওর ও উপকূলবর্তী এলাকা আছে, যেসব এলাকার খবর সংগ্রহ করা দুরূহ।

ব্রিটেনে বরিস জনসন করোনা দেখা দেওয়ার প্রথম দিকে ততটা গুরুত্ব না দিলেও নিজে করোনায় ভুগে ওঠার পর এখন এই রোগ প্রতিরোধে কঠোর হয়ে উঠেছেন। ফলে ব্রিটেনের অবস্থা ভালোর দিকে। দোকানপাট, শপিংমল ইত্যাদি খুলে দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সব স্কুল-কলেজ খুলে যাবে। এখন সামার। দিনভর সূর্যের আলো ঝলমল করে। দিনও বড় হয়েছে। রাত ১০টায়ও সূর্যের আলো থাকে। সরকারও তাই পার্কে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তবে একত্রে চার-পাঁচ জনের বেশি নয়। সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও একটু কমিয়ে রাখা হয়েছে। তবে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াতের মুখে অবশ্যই মাস্ক লাগাতে হবে। নইলে অর্থদণ্ড।

বাংলাদেশে অবশ্য এখন আবার লকডাউনের ব্যবস্থা ও সামাজিক দূরত্ব কঠোর করে লাভ নেই। ভুল যা হওয়ার তা মধ্যপথেই হয়েছে, যখন অবস্থার একটু উন্নতি হতেই নব্য ব্যবসায়ীদের স্বার্থে লকডাউন ও সোশ্যাল ডিফারেন্স শুধু শিথিল করা নয়, বলতে গেলে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আর আমাদের শহুরে শিক্ষিত মানুষের অধিকাংশের মধ্যে যেমন নিজেদের স্বাস্থ্যসচেতনতা নেই, তেমনি নেই নাগরিক দায়িত্ববোধ। সরকার একা কী করে সব দিক সামলাবে। করোনা মোকাবিলায় সরকার ছুটির দিন বাড়াতেই লকডাউন অগ্রাহ্য করে ঢাকার শহরবাসী দলে দলে মোটর হাঁকিয়ে গ্রামে ছুটেছে। সঙ্গে করে গ্রামেও নিয়ে গেছে করোনার জীবাণু। যেন এটা ঈদের ছুটি—এমনভাবে সবাই গ্রামের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিল। ঈদে অধিকাংশ শপিংমলও খুলে দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানেও কমবেশি ভিড় জমেছিল।

একটা বিষাক্ত ভাইরাস শুধু একবার হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হয় না, দ্বিতীয়বার আরো জোরেসোরে হামলা চালায়। এটা দেখা গেছে শতাধিক বছর আগে স্পেনীয় ফ্লুর সময়। এই ফ্লুর প্রথম দফা হামলায় যত লোক মরেছে, তার চাইতে বেশি লোক মারা গেছে দ্বিতীয় দফা হামলায়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, করোনা বা কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় দফা হামলা আসন্ন। তাতে সারা পৃথিবীতে আরো বহু হাজার মানুষের মৃত্যু হবে। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে পড়বে।

এই বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো ইতিমধ্যে এমনভাবে ভেঙে গেছে, পশ্চিমা অর্থনীতিবিদেরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, এবারের অর্থনৈতিক মন্দা বা সংকট ১৯৩০ সালের সংকটের চাইতেও ভয়াবহ হবে। ধনবাদী বিশ্বের নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প তাই ইতিমধ্যে এই ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণ ঘোষণা করে মার্কিন অর্থনীতি যতটা টাইট করা যায় তা করছেন। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ প্রস্তাব দিয়েছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত ইউরোপ ও তার অর্থনীতিকে রক্ষার জন্য আমেরিকা যেমন মার্শাল প্ল্যান নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, এবার সারা বিশ্বকে রক্ষার জন্য আরো বড় আকারের মার্শাল প্ল্যানের দরকার হবে।

এখানেও একটি প্রশ্ন আছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আমেরিকা ‘নামকা ওয়াস্তে’ যোগ দিয়েছিল। তার কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় দেশগুলোকে কাবুলিওয়ালার মতো চড়া সুদে অর্থ ধার দিয়ে নিজে অর্থেবিত্তে লাল হয়ে উঠেছিল। এবার ক্রমাগত গালফ যুদ্ধে জড়িত থেকে মার্কিন আর্থিক শক্তি আগের মতো শক্তিশালী নয়। বহির্বাণিজ্যে চীনের কাছে তাকে মার খেতে হচ্ছে। করোনাও আমেরিকার অর্থনীতিতে কম আঘাত হানেনি।

এই অবস্থায় গোটা বিশ্বের জন্য মার্শাল প্ল্যান তৈরিতে এবার আমেরিকা সক্ষম হবে কি? আর যদি সক্ষম হয়ও, আগামী নভেম্বর মাসে আমেরিকার প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে যদি ট্রাম্প জয়ী হন, তাহলে তিনি কি চাইবেন কোনো প্রকার হিডেন এজেন্ডা ছাড়া এই প্ল্যানের সাহায্য বিশ্বের সব দেশকে দিতে? তার বর্ণবাদী ও আধিপত্যবাদী মনোভাব দ্বারা মার্শাল প্ল্যানের সাহায্য বণ্টন করতে চাইলে তা বিশ্বের ভয়াবহ আর্থিক মন্দা ঠেকাতে কতটা সফল হবে তা বলা মুশকিল। ট্রাম্প আধিপত্যবাদী মনোভাব নিয়ে বিশ্বকে সাহায্যের জন্য মার্শাল প্ল্যান নিয়ে এগোলে চীনও বসে থাকবে না। করোনার হামলায় এবং তার চীনবিরোধী বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়ায় চীনেরও অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হয়নি। তবু আমেরিকার সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যে বা বিশ্বকে অর্থনৈতিক সাহায্যদানের প্রতিযোগিতায় চীন পিছপা হবে তা মনে হয় না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনা-পরবর্তী বিশ্বের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে যদি স্নায়ুযুদ্ধ এবং ট্রাম্পের হুমকির যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ব সহজে ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবে না। প্রথম মহাযুদ্ধের পর ১৯৩০ সালের মন্দায় জার্মানির মতো দেশে পর্যন্ত দুর্ভিক্ষে মানুষ মরেছে, রাষ্ট্রবিপ্লব হয়েছে, ফ্যাসিবাদের অভ্যুদয় হয়েছে। তেমনি এবারের আর্থিক মন্দা বহু দেশে দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর ঘটাতে পারে। বেকারের সংখ্যা এত বেশি হবে যে অনেক দেশে সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের ধাক্কা শুরু হতে পারে।

এগুলো হলো আশঙ্কার কথা। বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে বলছেন, মানুষ যা ঘটাতে চায়নি, প্রকৃতি তা ঘটাবে। ম্যালথাস-থিয়োরি অনুযায়ী বিশ্বে জনসংখ্যা কমবে। বিশ্বের বড় বড় শহরে যানজট কমবে। পরিবেশদূষণ কমবে (ঢাকায় ইতিমধ্যে পরিবেশদূষণ কমেছে দেখা গেছে)। মানুষের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়বে। মানুষের সামাজিক আচরণে অনেক পরিবর্তন আসবে। যেমন ইতিমধ্যে হস্তমর্দন বা শেকহ্যান্ড বিলাতেও উঠে গিয়ে হাত তুলে আদাব বা সালাম বিনিময় হচ্ছে। ইতিমধ্যে ‘লাভ মি ইউদাউট কিস’ (চুমু ছাড়া আমাকে ভালোবাসা দেখাও) শীর্ষক গেঞ্জি ও শার্ট বাজারে বেরিয়েছে। অবশ্য সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন করোনার ভয়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদের চুম্বন বিনিময় স্থগিত থাকলেও ভবিষ্যতে তা ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

এখন আসি নিজের দেশের কথায়। দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে চললেও রোগমুক্তির সংখ্যা বহুগুণ বেশি। এটা এখন আশার কথা। হঠাত্ করে লকআউট তুলে দেওয়া, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলে দেওয়ায় যে ভুলটা হয়েছে, সেই ভুলে ভাইরাসটা এত বেশি ছড়িয়েছে, যাতে রোগ সংক্রমণ বেড়ে গিয়ে বর্তমান সমস্যার সৃষ্টি করেছে। অনেক বিশিষ্টজনও তাতে মারা যাচ্ছেন। সরকার সর্বশক্তি নিয়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। সর্বস্তরের জনগণের উচিত এই প্রচেষ্টায় সরকারকে সহযোগিতা দেওয়া।

কেবল করোনা নয়, সামনে আসছে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা। বাংলাদেশের জন্য একটাই আশার কথা, দেশে এবার কৃষির ফলন ভালো হয়েছে এবং ফসল কেটে চাষিরা গোলায়ও তুলেছেন। তাতে দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা কম। কিন্তু অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরে যে ধাক্কা আসবে, তা সামলানোর জন্য সরকারকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। হাসিনা সরকারের জন্য এবারের অর্থনৈতিক মন্দা সামলানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রার্থনা করি, সরকার যেন তা কাটাতে পারে, তাতে সরকার ও দেশ দুইয়েরই মঙ্গল।

[ লন্ডন, ২৭ জুন, শনিবার, ২০২০ ]