নেপালের পক্ষে ভারতকে এড়িয়ে চলা কতটা সম্ভব?

শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা ছিল জোটনিরপেক্ষতা, উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান। নব্য উপনিবেশ রুখতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ‘নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিন্যাস’ (ইংরেজিতে সংক্ষেপে new)-এর অন্যতম উদ্যোক্তা ভারত। বহির্বিশ্বের এমন নীতি নিয়ে আগালেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থার পাশাপাশি নেপাল, শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না ভারতের।

 বিশেষ করে নেপালের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি নিয়ে দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা হতবাক। নেপালের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ইন্দো-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি ১৯৫০’কে ভারত-নেপাল সম্পর্কের ভিত্তি ধরা হয়। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কালাপানি ও লিপুলেখ নিয়ে সীমান্তবিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধ নিরোসনসহ ভারত নেপালের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত করতে ২০১৬ সালে উচ্চপদস্থ ‘ইমিনেন্ট পারসন গ্রুপ’ গঠন করা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মীর ও লাদাখকে ভারতীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে মানচিত্র প্রকাশের সময় ভারত বিরোধপূর্ণ কালাপানিকে নিজেদের অংশ হিসেবে দেখালে নেপালের দিক থেকে অসন্তুষ্টি শুরু হয়। এই অসন্তোষের মধ্যে গত ৮ মে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কালাপানির পার্শ্ববর্তী লিপুলেখে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা উদ্বোধন করেন। নেপালের পক্ষ থেকে এই রাস্তার অন্তত ১৭ কিলোমিটার তাদের ভূমির ওপর দিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। বিতর্কিত এই ভূমি নিয়ে নেপালে বিক্ষোভ চলাকালে কালাপানি লিপুুলেখ ও লিম্পিওয়াধুরার ৩৩৫ কিলোমিটার এলাকাকে নিজেদের দাবি করে ‘রাজনৈতিক মানচিত্র’ প্রকাশ করে, যা পরবর্তী সময়ে সংসদের নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ থেকে পাশ করিয়ে নেওয়া হয়। পালটাপালটি মানচিত্র প্রকাশ দুই দেশের সম্পর্ককে বর্তমানে তলানিতে নিয়ে গেছে। অথচ নেপাল-ভারতের মধ্যে সম্পর্ক রাজনৈতিক দল থেকে রাজপরিবার, সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে আত্মীয়তার পর্যায়ে।

নেপালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে ২০০৮ সালে যখন রাজতন্ত্র বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রজাতান্ত্রিক নেপাল ঘোষণা করা হয়। ভারতের প্রত্যাশা ছিল গণতান্ত্রিক নেপাল তার জন্য সুখকর হবে। কিন্তু ২০১৫ সালের এপ্রিলের ভূমিকম্প সব এলোমেলো করে দেয়। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ব্যর্থতায় সমালোচনার মুখে পড়ে কংগ্রেস সরকার। সে সময় ত্রাণ কূটনীতি নিয়ে নেপালের পাশে দাঁড়ায় ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। একই বছরে নেপালের নতুন সংবিধান রচনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয় নেপালের। ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ মদহেশিদের অভিযোগ, নতুন সংবিধানে এমনভাবে প্রদেশের সীমানা ভাগ করা হয়েছে, যাতে সাতটির মধ্যে ছয়টি প্রদেশে মদহেশিদের ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। সংবিধানের বিরুদ্ধে ‘মদহেশীদের আন্দোলনের মুখে’ ভারত নেপালে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর নতুন সংবিধান গৃহীত এবং ১০ অক্টোবর সংসদে নেপালি কংগ্রেসকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন কমিউনিস্ট পার্টির কে পি শর্মা অলি। তখন জ্বালানি তেলের জন্য দেশ জুড়ে হাহাকার। ভারতের অবরোধে বেকায়দায় পড়া কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রীর   পাশে জ্বালানি তেল নিয়ে দাঁড়ায় চীন। ভারতের অবরোধে ভুক্তভোগী নেপাল সরকার পরবর্তী বছর চীনের সঙ্গে ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট চুক্তি করে, যার মাধ্যমে চীনের চার সমুদ্রবন্দর ও তিন স্থলবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার অনুমতি পায় নেপাল।

২০১৭ সালে নতুন সংবিধানের অধীনে প্রথম নির্বাচনে স্বস্তিদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবারও ক্ষমতায় আসে মাওবাদী ও কমিউনিস্টদের বামপন্থি জোটের কে পি শর্মা অলি। শর্মা অলির সরকার ২০১৮ সালে বিমসটেকের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের পুনেতে অনুষ্ঠিত জঙ্গি দমন মহড়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সমসাময়িক সময়ে চীনের সিচুয়ানের জঙ্গি দমন মহড়ায় যোগ দিলে কূটনৈতিক ধাক্কা খায় ভারত।

 কিন্তু নেপালের পক্ষে ভারতকে এড়িয়ে চলা এত সহজ নয়। ২০১৩-২০১৪-এর হিসাবমতে নেপাল তার মোট রপ্তানির ৬৬ শতাংশ করে ভারতে। নেপালের মোট বিনিয়োগের ৪০ শতাংশ ভারতীয় কোম্পানির। প্রতি বছর ৩ হাজার নেপালি ছাত্র ভারতে পড়তে যায়। ভারতে নেপালি নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয় না। তাছাড়া দুই দেশের মধ্যে মুক্ত ভিসা চুক্তি ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। ভারতে প্রায় ১৫ লাখ নেপালি কাজ করেন। আনঅফিশিয়ালি এই সংখ্যা ৭০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে নেপালে বাস করছে প্রায় ৬ লাখ ভারতীয়। মদহেশিরা ভারতীয়দের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। এছাড়া সাংস্কৃতিকভাবেও নেপালে ভারতের প্রভাব রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করেন নেপালের বিখ্যাত গোর্খা রেজিমেন্টের ৪০ হাজার সদস্য। ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া ৮০ হাজার নেপালি এখনো অবসর ভাতা পান ভারত থেকে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নেপাল-ভারত সীমান্তের ১৫টি সীমান্ত পোস্টে সেনা মোতায়েন করেছে নেপাল। চলমান উত্তেজনার মধ্যে এক ভারতীয় শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করেছে নেপালি পুলিশ। নেপালের সেনাপ্রধান বিতর্কিত কালাপানি পরিদর্শনে গেছেন। ভারতের বিহার রাজ্যের সীমান্তে বাঁধ নির্মাণে বাধা দিয়েছে নেপাল। কলকাতা বন্দর থেকে নেপালের দূরত্ব ৯৩৩ কিলোমিটার। অন্যদিকে চীনের নিকটতম সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে দূরত্ব ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। ফলে অতিমাত্রায় চীননির্ভরও নেপালের পক্ষে সম্ভব নয়। এছাড়া কোনো ধরনের সংঘর্ষ শুরু হলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ৪০ হাজার গোর্খা সৈন্য নিয়ে বিপাকে পড়বে ভারত। ফলে এই মুহূর্তে ‘অপেক্ষা করো পর্যবেক্ষণে থাকো’ নীতি ছাড়া অন্য কোনো নীতি খোলা নেই নয়াদিল্লির সামনে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়