রেমিট্যান্স যোদ্ধা প্রবাসীদের জীবন

সবুজ আহমেদ

দেশের প্রায় ১৫ লক্ষ তরুণ-তরুণী প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কর্মসংস্থান এবং কর্মদক্ষতার অভাবে, বিশেষ করে তরুণদের বিরাট একটা অংশ কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে প্রবাসে চলে যাচ্ছে। দেশে প্রবাসীদের অর্থ আহরণের শীর্ষ ১৫টি উত্স দেশ হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, ইতালি, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও জর্ডান।

নিজের পরিবারের শেষ জমিজমা এমনকি ভিটামাটি বিক্রি করে এবং আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত মানুষদের থেকে টাকা ধার নিয়ে নিজের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা না করে বিদেশে চলে যান। অনেকেই দালালের হাতে পড়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যান। পরিবার টিকিয়ে রাখার মতো কিছুই থাকে না  অবশেষে। বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু, স্বজন থেকে শুরু করে প্রিয়জন ও প্রাণের মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান ভিনদেশে। একজন বেকার মানুষ যখন প্রবাসে পাড়ি জমান তখন তার মাথায় থাকে এক ঝাঁক স্বপ্ন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন তথা সমাজের পরিবর্তনসহ সর্বোপরি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকাকে ত্বরান্বিত করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। পরদেশে যাওয়ার পরে প্রথমেই জর্জরিত হতে হয় নানাবিদ সমস্যায়। পরিচিত হয় ভিনদেশি ভাষার সঙ্গে। মনে প্রাণে খোঁজে মাতৃভাষায় কথা বলা লোকজনদের।

তথ্য মতে, শ্রমবাজারের বাংলাদেশি প্রবাসীরা যে পরিমাণে পরিশ্রম করে তার তুলনায় পারিশ্রমিক পান তার অর্ধেক। যোগ্যতা এবং দক্ষতা থাকার পরেও  অনেক প্রবাসী বঞ্চিত হচ্ছে তার ন্যায্য মজুরি থেকে। অনেক প্রবাসী রয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও যোগ্যতা এবং দক্ষতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত বেতন পাচ্ছেন না। অথচ যদি তাদের দেশ থেকে যাওয়ার পূর্বে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করা হয় তাহলে আজকে যোগ্যতার অভাবে পদে পদে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা শুনতে হতো না। এমন নানান সমস্যায় জর্জরিত আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

অনেক প্রবাসী রয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও বিভিন্নভাবে মানুষিক এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। প্রতিনিয়ত এমন হাজার কষ্ট নিয়ে প্রবাসীরা আমাদের রেমিট্যান্সসমৃদ্ধ করছে। অর্থনৈতির চাকা সচল রাখতে প্রতি বছর বাজেটে বিরাট অবদান রাখছে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের এই বিশাল অবদানের কথা আমরা কীভাবে ভুলে যাই! বঞ্চিত করি ন্যায্য অধিকার থেকে। প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই দিন রাত পরিশ্রম করে মাস শেষে বেতনের সব টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন। এক এক করে সকলের দাবি মেটাতে ওভারটাইম করে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থাও করে ফেলে। তবুও আমাদের চাওয়ার কোনো শেষ নেই তাদের থেকে। মানুষটা কেমন আছে, কেমন কাটছে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে তার খোঁজ কে বা কারাই রাখে। এবার করোনার মহামারির মধ্যে অনেক প্রবাসীরা ছুটিতে দেশে ফিরে আসছে এবং তারা আবার প্রবাসে ফিরে যাওয়া নিয়ে  এখনো রয়েছেন তাদের ভবিষ্যত্ দুশ্চিন্তায়।

সরকার বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করে। সেই অনুযায়ী, প্রবাসীরা প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে দুই টাকা প্রণোদনা পাচ্ছেন। যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ।

বর্তমান এই ডিজিটালাইজেশনের যুগে প্রবাসীদের নিয়ে ভাবতে হবে এবং তাদের নিয়ে স্বচ্ছ পরিকল্পনা করতে হবে। আগামীর বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসীদের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে বিভিন্ন জেলায় সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের দেওয়া রেমিট্যান্সে আমরা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছি। ভালো থাকুক সকল প্রবাসীরা।

n লেখক :শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়